বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

প্রেমে ডুবে গেলে নিজেকে সামলাবেন যেভাবে

peachey_counselling_what-kind-of-relationship-are-you-in-healthy-relationships-dos-donts

নতুন কারও সঙ্গে পরিচয়ের পর হঠাৎ করেই কি আপনার দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ বদলে গেছে? কাজে মন বসছে না, খাওয়ার সময়ও তার কথাই মনে পড়ছে, রাতে ঘুম আসতে চাইছে না। বারবার ফোন হাতে নিয়ে দেখছেন তিনি মেসেজ দিয়েছেন কি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রোফাইল ঘুরে দেখছেন, পুরোনো ছবিতে চোখ রাখছেন, কখন অনলাইনে আসছেন সেটাও খেয়াল করছেন। চারপাশের মানুষের কথা যেন ঠিকমতো কানেই ঢুকছে না।

প্রেমের শুরুর দিকে এমন তীব্র আকর্ষণ ও মানসিক ব্যস্ততা অনেকেরই হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘লিমারেন্স’।

লিমারেন্স বলতে কাউকে ঘিরে তীব্র আকর্ষণ, কৌতূহল এবং বারবার তার কথা ভাবতে থাকার এক ধরনের মানসিক অবস্থাকে বোঝায়। সম্পর্কের একেবারে শুরুর পর্যায়ে এ ধরনের অনুভূতি দেখা দিতে পারে। এ সময় মস্তিষ্কে ডোপামিনের কার্যকলাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষটির প্রতি আকর্ষণ আরও তীব্র মনে হতে পারে।

তখন মনে হয়, জীবনের সবকিছুর কেন্দ্র যেন ওই একজন মানুষই। তার একটি মেসেজ আনন্দ বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার উত্তর না পেলে মন খারাপও হতে পারে। অনুভূতিটা স্বাভাবিক হলেও সমস্যা তখনই, যখন এই আকর্ষণ আপনার দৈনন্দিন জীবন, কাজ, পড়াশোনা কিংবা মানসিক স্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

বিশেষ করে যদি আপনি সম্পর্কটিতে তুলনামূলকভাবে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, অথচ অপর ব্যক্তি স্বাভাবিক ও সংযত থাকেন, তাহলে নিজের ভেতরের অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আবেগকে অস্বীকার না করে কীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

অনুভূতিকে স্বীকার করুন, কিন্তু সব তাগিদ অনুসরণ করবেন না

কারও প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলে বারবার যোগাযোগ করতে ইচ্ছা হতে পারে। মনে হতে পারে এখনই মেসেজ দেওয়া দরকার, নিজের সব অনুভূতির কথা জানিয়ে দেওয়া দরকার কিংবা তার কাছ থেকে দ্রুত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া জরুরি।

Advertisements

কিন্তু প্রতিটি অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন নেই। মনের তাগিদকে একটু সময় দিন। মেসেজ পাঠানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—এটি সত্যিই প্রয়োজন, নাকি মুহূর্তের আবেগ থেকে করছেন?

নিজের আবেগকে বুঝতে শেখা মানে অনুভূতিকে দমন করা নয়; বরং আবেগের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।

নিজের রুটিন যেন বদলে না যায়

নতুন প্রেমের উত্তেজনায় নিজের জীবনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে একেবারে পাশে সরিয়ে রাখবেন না। কাজ, পড়াশোনা, ব্যায়াম, ঘুম, পরিবার ও বন্ধুদের জন্য যে সময় বরাদ্দ থাকে, তা যথাসম্ভব বজায় রাখুন।

কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে বলেই আপনার নিজের জীবন থেমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যতটা বজায় রাখতে পারবেন, আবেগের ওঠানামাও তত সহজে সামলাতে পারবেন।

মনকে অন্য কাজেও ব্যস্ত রাখুন

একই মানুষকে নিয়ে সারাক্ষণ ভাবতে থাকলে মস্তিষ্কের মনোযোগ ধীরে ধীরে একটি বিষয়েই আটকে যেতে পারে। তাই এমন কাজে নিজেকে যুক্ত করুন, যেখানে মনোযোগ প্রয়োজন।

বই পড়া, লেখালেখি, রান্না, নতুন কোনো দক্ষতা শেখা, শরীরচর্চা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—যে কাজগুলো আপনাকে আনন্দ দেয়, সেগুলো নিয়মিত করুন।

এতে ওই মানুষটির কথা একেবারেই মনে পড়বে না, এমন নয়। তবে আপনার পুরো দিনের নিয়ন্ত্রণ যেন একটি সম্পর্কের হাতে চলে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

মানুষটিকে দেখুন বাস্তবতার চোখে

প্রেমের শুরুর সময়ে আমরা অনেক সময় একজন মানুষকে যতটা চিনি, তার চেয়ে বেশি কল্পনা করে ফেলি। তার কিছু ভালো গুণকে কেন্দ্র করে মনের মধ্যে একটি আদর্শ ছবি তৈরি হতে পারে।

তাই নিজেকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করুন—‘আমি কি সত্যিই এই মানুষটিকে যথেষ্ট চিনি, নাকি তার সম্পর্কে নিজের কল্পনাকেই বেশি ভালোবেসে ফেলেছি?’

একজন মানুষের প্রতি আকর্ষণ আর তাকে বাস্তবে বোঝা এক বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে তার আচরণ, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও অন্য মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়। তাই সম্পর্কের শুরুতেই কাউকে সম্পূর্ণভাবে আদর্শ মানুষ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত নজরদারি এড়িয়ে চলুন

তিনি কখন অনলাইনে এসেছেন, কার পোস্টে লাইক দিয়েছেন, আপনার মেসেজ দেখে কেন উত্তর দিচ্ছেন না—এসব নিয়ে বারবার ভাবতে থাকলে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

একইভাবে তার পুরোনো ছবি ঘাঁটা, বারবার প্রোফাইল দেখা কিংবা অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার অভ্যাসও আপনাকে আরও বেশি মানসিকভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিজের জন্য কিছু সীমা ঠিক করা ভালো। সবকিছুর তাৎক্ষণিক উত্তর জানা বা প্রতিটি অনলাইন আচরণের অর্থ খোঁজার প্রয়োজন নেই।

সম্পর্ককে সময় দিন

নতুন সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রুত সবকিছুর উত্তর পাওয়ার চেষ্টা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। কে কতটা ভালোবাসে, সম্পর্কটি কোথায় যাবে কিংবা অপর ব্যক্তি ভবিষ্যতে কী চান—এসব বিষয় সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হয়।

বিশ্বাস ও বোঝাপড়া একদিনে তৈরি হয় না। তাই সম্পর্কের শুরুতে ধীরে এগোনো এবং একে অপরকে জানার সুযোগ দেওয়া জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তীব্র অনুভূতি মানেই গভীর সম্পর্ক নয়। আবার তীব্র আকর্ষণ থাকলেই সেটি অস্বাস্থ্যকর—এমনটিও নয়। একটি সুস্থ সম্পর্ক আপনার জীবনে আনন্দ ও ইতিবাচকতা যোগ করবে, কিন্তু আপনার কাজ, পড়াশোনা, ঘুম, আত্মসম্মান কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে না।

তবে যদি দেখেন, কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে এই অনুভূতির কারণে কাজ বা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছেন না, খাওয়া ও ঘুমের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ছে, অপর ব্যক্তির আচরণ বা প্রতিক্রিয়ার ওপর আপনার মেজাজ সম্পূর্ণ নির্ভর করছে কিংবা উদ্বেগ এতটাই বেড়ে গেছে যে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে—তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

Advertisements
আকর্ষণপ্রেমমনোবিজ্ঞান