৪ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

চিন্তা থেকে কাজ, কাজ থেকে স্বস্তি—ওসিডির অদৃশ্য চক্র

how-to-help-someone-with-ocd-management

দরজা বন্ধ করার পর একবার ফিরে গিয়ে তালা পরীক্ষা করা, হাত ধোয়ার পর আবারও ধোয়া, ঘরের জিনিসপত্র নির্দিষ্ট ক্রমে সাজিয়ে রাখা—এসব আচরণ অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। সাধারণভাবে এগুলোকে অভ্যাস, সতর্কতা কিংবা পরিচ্ছন্নতাপ্রিয়তা বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু কোনো কাজ বারবার করার তাগিদ যদি নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সেটি না করা পর্যন্ত অস্বস্তি বা উদ্বেগ কমে না, তখন বিষয়টি আর নিছক অভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এ ধরনের আচরণ অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা ওসিডির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এটি এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেখানে অনিচ্ছাকৃত কিছু চিন্তা, ভয় বা অস্বস্তি বারবার মনে আসে। সেই অস্বস্তি কমানোর জন্য ব্যক্তি একই কাজ বারবার করতে বাধ্য বোধ করেন।

ওসিডির ক্ষেত্রে প্রথমে মাথায় আসতে পারে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা বা ভয়। যেমন—হাত ঠিকমতো পরিষ্কার হয়নি, দরজা তালাবদ্ধ করা হয়নি অথবা কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। এসব চিন্তা থেকে উদ্বেগ তৈরি হয়। উদ্বেগ কমাতে ব্যক্তি আবার হাত ধোন, তালা পরীক্ষা করেন কিংবা নির্দিষ্ট কোনো কাজ বা কথা পুনরাবৃত্তি করেন। কাজটি করার পর কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি মিললেও পরে একই চিন্তা আবার ফিরে আসে। এভাবেই তৈরি হয় উদ্বেগ ও পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণের একটি চক্র।

তবে সব ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণকে ওসিডি বলা ঠিক নয়। কেউ ঘর গোছাতে পছন্দ করেন কিংবা বের হওয়ার আগে নিরাপত্তার জন্য দুবার দরজা পরীক্ষা করেন—এগুলো স্বাভাবিক অভ্যাসের মধ্যেই পড়তে পারে। পার্থক্যটা বোঝা যায় তখন, যখন কোনো কাজ না করা পর্যন্ত তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়, কাজটি করতে অস্বাভাবিক পরিমাণ সময় চলে যায় এবং ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারেন যে আচরণটি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে যাচ্ছে, তবু নিজেকে থামাতে পারেন না।

ওসিডি শুধু পরিচ্ছন্নতা বা হাত ধোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারও ক্ষেত্রে সবকিছু নির্দিষ্টভাবে সাজিয়ে রাখার তীব্র প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কোনো জিনিস সামান্য এদিক-সেদিক থাকলেও অসম্পূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। আবার কারও মাথায় এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা আসতে পারে, যা তিনি নিজেই চান না। প্রিয়জনের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার ভয়, নিজের নৈতিকতা বা বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো চিন্তা কিংবা কোনো ভুল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও বারবার ফিরে আসতে পারে।

ধর্মীয় ও নৈতিক বিষয় নিয়েও অতিরিক্ত সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। কোনো ধর্মীয় আচার সঠিকভাবে পালন হয়েছে কি না, তা নিয়ে বারবার সংশয় তৈরি হওয়া এবং সেই সংশয় দূর করতে একই কাজ বা প্রার্থনা পুনরাবৃত্তি করাও ওসিডির একটি প্রকাশ হতে পারে।

Advertisements

ওসিডির পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ কাজ করে না। বংশগত প্রভাব, মস্তিষ্কের গঠন ও রাসায়নিক কার্যক্রমের পার্থক্য এবং তীব্র মানসিক চাপ বা কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এটি ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা বা কোনো ‘খারাপ ইচ্ছা’র ফল নয়। বরং আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় বুঝতে পারেন যে তার চিন্তা বা আচরণের যথেষ্ট যুক্তি নেই, কিন্তু উদ্বেগের চাপ তাকে সেই আচরণ থেকে বিরত থাকতে দেয় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওসিডি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো সমস্যা নয়। সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে এর উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ ধরনের সাইকোথেরাপি, বিশেষ করে এক্সপোজার অ্যান্ড রেসপন্স প্রিভেনশন বা ইআরপি, ওসিডির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ওষুধও দেওয়া হতে পারে।

পরিবারের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে একই কাজ বারবার করতে দেখে ‘চাইলেই তো বন্ধ করতে পারো’ বলা, উপহাস করা কিংবা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া তার মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বরং তার অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে পাশে থাকা এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে উৎসাহিত করাই বেশি কার্যকর।

তাই কোনো অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে শুধু ‘অভ্যাস’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে খেয়াল করা জরুরি—এটি কি স্বাভাবিক পছন্দ, নাকি উদ্বেগ কমানোর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে করা একটি আচরণ? কারণ পার্থক্যটা বুঝতে পারাই হতে পারে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার প্রথম ধাপ।

Advertisements