বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

নিম-করলা-জামের রস: রোগ প্রতিরোধে কতটা কার্যকর?

bb40b3f9-6944-4e7e-a345-1e1ccdbe0d84 (1)

নিম, করলা ও জাম—তিনটি উপাদানই আমাদের পরিচিত এবং দীর্ঘদিন ধরে খাবার ও প্রচলিত ভেষজ ব্যবহারে জায়গা করে নিয়েছে। বর্তমানে এই তিনটি একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি জুস নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। কেউ এটি হজমশক্তি ভালো রাখা, কেউ শরীরকে সতেজ রাখা, আবার কেউ বিভিন্ন রোগ থেকে দূরে থাকার আশায় পান করছেন।

তবে কোনো কিছু প্রাকৃতিক হলেই সেটি সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ বা কার্যকর—এমনটা ভাবা ঠিক নয়। নিম, করলা ও জামের পৃথক কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা থাকলেও তিনটি উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি জুস নিয়মিত পান করলে দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের নির্দিষ্ট উপকার পাওয়া যায়, সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তিন উপাদানে কী আছে

করলায় চ্যারানটিন, ভিসিন ও পলিপেপটাইড-পি-এর মতো প্রাকৃতিক যৌগ রয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক বিপাক ও হজম প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।

জামে রয়েছে পলিফেনল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ। ফলে ফল হিসেবে জাম একটি পুষ্টিকর খাবার। এর বীজের বিভিন্ন ভেষজ ব্যবহার নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

অন্যদিকে নিম পাতায় নিমবিন, নিমবিডিন ও অ্যাজাডিরাকটিনের মতো উদ্ভিজ্জ যৌগ পাওয়া যায়। এসব যৌগের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই নিম, করলা ও জাম একসঙ্গে খাওয়ার বিষয়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু এসব উপাদানের গুণাগুণের ভিত্তিতে মিশ্র জুসকে কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

Advertisements

শরীরে সম্ভাব্য প্রভাব

নিম, করলা ও জামে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর অণুর প্রভাব থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করে।

করলার কিছু উপাদান হজম প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। জামের উদ্ভিজ্জ যৌগগুলো শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। নিমের কিছু উপাদানের প্রদাহ কমানোর সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

তবে এগুলোকে সম্ভাব্য উপকার হিসেবে দেখা উচিত। কোনো নির্দিষ্ট রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা বা প্রতিরোধ হিসেবে এই জুসকে ব্যবহার করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

সাত দিনেই কি বড় পরিবর্তন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, নিয়মিত নিম-করলা-জামের জুস পান করলে মাত্র সাত দিনের মধ্যেই শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। কিন্তু এ ধরনের দাবির পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ভেষজ উপাদানের প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক রকম নাও হতে পারে। জুসের পরিমাণ, তৈরির পদ্ধতি, কত দিন ধরে পান করা হচ্ছে এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা—সবকিছুই এর প্রভাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কয়েক দিন এই পানীয় পান করলেই কোনো রোগ প্রতিরোধ হবে কিংবা শরীরে নির্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটবেই—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।

প্রাকৃতিক হলেও কেন সতর্কতা দরকার

নিম, করলা ও জাম পরিচিত প্রাকৃতিক উপাদান হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে বা ভুলভাবে গ্রহণ করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত কোনো ওষুধ সেবন করেন, তাদের ভেষজ জুস নিয়মিত খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রেও নিজের সিদ্ধান্তে নিয়মিত এ ধরনের জুস পান করা উচিত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বন্ধ করে শুধু নিম-করলা-জামের জুসের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়। প্রাকৃতিক উপাদান চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না।

তাহলে কীভাবে দেখবেন এই জুসকে?

নিম-করলা-জামের জুসকে চাইলে খাদ্যতালিকার একটি ভেষজ পানীয় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এটিকে ‘সব রোগের সমাধান’ বা অলৌকিক কোনো পানীয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

সুস্থ থাকতে একটি নির্দিষ্ট পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিক উপাদানের কিছু উপকারী বৈশিষ্ট্য থাকতেই পারে। তবে বেশি খেলেই বেশি উপকার হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। যেকোনো ভেষজ উপাদান গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমাণ, ব্যবহারের নিয়ম এবং নিজের শারীরিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

Advertisements
করলাজামনিমরস