বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

সিটবেল্ট পরতে নারাজ শিশু, বাতিল হলো পুরো ফ্লাইট

6a7a17f66a326_image

উড্ডয়নের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত বিমান। যাত্রীরা নিজেদের আসনে বসে, বিমানও রানওয়েতে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশে ওড়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ এক শিশুকে ঘিরে তৈরি হলো জটিলতা। কোনোভাবেই সে নিজের আসনে বসতে বা সিটবেল্ট বাঁধতে রাজি হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিমানটি রানওয়ে থেকে টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয়। নামিয়ে দেওয়া হয় শিশুটিকে ও তার পরিবারকে। পরে বাতিল করা হয় পুরো ফ্লাইট।

কানাডার ভিক্টোরিয়া থেকে টরন্টোগামী পোর্টার এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে গত ৬ আগস্ট ঘটে ঘটনাটি। বিষয়টি সামনে আসার পর বিমানযাত্রায় শিশুদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, অভিভাবকদের দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা বিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিমানটি উড্ডয়নের প্রস্তুতি শেষ করার সময় শিশুটি নিজের আসনের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে। তাকে আসনে বসিয়ে সিটবেল্ট পরানোর চেষ্টা করেন তার অভিভাবক ও কেবিন ক্রুরা। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি।
বিমান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, উড্ডয়নের সময় একজন যাত্রীর সিটবেল্ট না বাঁধা এবং আসনে না বসা নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় পাইলট বিমান ঘুরিয়ে টার্মিনালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর শিশুটিসহ তার পরিবারকে বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

এ ঘটনার কারণে নির্ধারিত সময়ে বিমানটি আর উড্ডয়ন করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ফ্লাইটটি বাতিল করা হয় এবং যাত্রীদের পরদিনের ফ্লাইটে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পোর্টার এয়ারলাইনস জানায়, শিশুটিকে শান্ত করে নিয়ম মেনে বসানোর জন্য অভিভাবক ও ক্রু সদস্যরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই বিমানটি টার্মিনালে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

শিশু ও বিমাননিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ লিয়া তুসোর মতে, এ সিদ্ধান্ত যথাযথ ছিল। তার ভাষ্য, বিমান উড্ডয়ন কিংবা অবতরণের সময় হঠাৎ ঝাঁকুনি হলে সিটবেল্ট ছাড়া থাকা শিশু গুরুতরভাবে আহত হতে পারে। তিনি বলেন, অনিরাপদ অবস্থায় থাকা কোনো যাত্রীই ঝুঁকিমুক্ত নন।

Advertisements

তবে ঘটনাটি নিয়ে সবার মত এক নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, শিশুটি হয়তো বিমানে ভয় পেয়ে এমন আচরণ করছিল। ফ্লাইটের এক যাত্রী আরিয়ে কোজুচের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি চিৎকার বা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করছিল না; বরং তাকে ভীত মনে হচ্ছিল। সে বারবার নিজের আসনের নিচে লুকিয়ে পড়ছিল।

এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে—একটি শিশুর আচরণের জন্য কি পুরো বিমানের শত শত যাত্রীর যাত্রা বাতিল হওয়া উচিত? কেউ কেউ মনে করছেন, পরিস্থিতি বুঝে পরিবারটিকে আগেই বিমান থেকে নামিয়ে দিলে হয়তো পুরো ফ্লাইট বাতিলের প্রয়োজন পড়ত না।

বিমানে শিশুদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো থেকে আটলান্টাগামী সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটেও এক বাবা ও তার মেয়েকে বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা আলোচনায় এসেছিল। ভিডিও ধারণকারী এক যাত্রীর দাবি ছিল, শিশুটি পরে শান্ত হয়ে নিজের আসনে বসেছিল। তবে বিমান কর্তৃপক্ষ জানায়, শিশুটির অভিভাবক ও ক্রু সদস্যদের মধ্যে কথোপকথন একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।

এরও আগে ২০১২ সালে একই ধরনের ঘটনায় একটি পরিবারকে বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে পরিবারটি একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গিয়ে বিমান সংস্থার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কঠোর আচরণের অভিযোগ তোলে। তবে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা জেটব্লুর দাবি ছিল, পরিবারটির কয়েকজন সদস্য দীর্ঘ সময় ধরে ক্রুদের নির্দেশনা মানছিলেন না। যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই ক্যাপ্টেন তাদের বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সাম্প্রতিক কানাডার ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, বিমানে শিশুদের সামলানো যেমন অভিভাবকদের জন্য চ্যালেঞ্জের, তেমনি নিরাপত্তা বিধি মানানোও এয়ারলাইনসের জন্য বাধ্যতামূলক। শিশুর ভয়, অস্বস্তি কিংবা জেদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন হলেও উড্ডয়নের সময় নিরাপত্তা নিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
ফলে প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—শিশুকে সামলাতে কতটা সহনশীল হওয়া উচিত, আর কখন নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি? কানাডার এই ঘটনা সেই বিতর্ককেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

Advertisements
ফ্লাইটশিশুসিটবেল্ট