বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

শিশু অমনোযোগী, নাকি তার মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছি আমরা?

child

একটি শিশু পড়ার টেবিলে বসেছে। সামনে বই, পাশে খাতা। হাতে পেনসিল। কিন্তু কয়েক মিনিট পরপরই তার চোখ চলে যাচ্ছে মোবাইলের দিকে। কখনো কলম নিয়ে খেলছে, কখনো চেয়ার ছেড়ে উঠে যাচ্ছে, আবার কখনো একই লাইন বারবার পড়েও কিছু মনে রাখতে পারছে না।

এমন দৃশ্য এখন অনেক পরিবারের কাছেই পরিচিত। আর তখন সবচেয়ে সহজ যে সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছে যাই, তা হলো—শিশুটি পড়াশোনায় মনোযোগী নয়।

কিন্তু একটু থেমে প্রশ্ন করা দরকার, শিশুটি কি সত্যিই অমনোযোগী, নাকি তার চারপাশের জীবনযাপনই এমন হয়ে গেছে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন?

একসময় শিশুর বিকেল মানেই ছিল মাঠে দৌড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করা, সাইকেল চালানো কিংবা পাড়ার গলিতে ছুটে বেড়ানো। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ট্যাব ও নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদন।

Advertisements

শুধু বিনোদন নয়, পড়াশোনার ক্ষেত্রেও স্ক্রিনের ব্যবহার বেড়েছে। অনলাইন ক্লাস, লার্নিং অ্যাপ, ডিজিটাল কনটেন্ট কিংবা স্মার্ট ডিভাইস এখন শিক্ষার অংশ। প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তৈরি হয় যখন শিশুর দিনের বড় একটি অংশ পর্দার সামনে কেটে যায় এবং তার বিপরীতে খেলাধুলা, বিশ্রাম ও বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে।

ফলে শিশুর মনোযোগের সমস্যাকে শুধু পড়াশোনার টেবিলে বসে বিচার করলে পুরো ছবিটা দেখা যায় না।

মনোযোগের শুরু পড়ার টেবিলে নয়

একটি শিশু পড়ার সময় কতটা মনোযোগী হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে সে দিনের বাকি সময় কীভাবে কাটিয়েছে তার ওপর।

সারাদিন যদি শিশুর শারীরিক কর্মকাণ্ড কম থাকে, বাইরে খেলার সুযোগ না থাকে এবং অবসর সময়ের বড় অংশ দ্রুত বদলে যাওয়া ভিডিও, গেম বা সোশ্যাল কনটেন্টে কেটে যায়, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই বা খাতার দিকে মনোযোগ ধরে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

কারণ ডিজিটাল পর্দা শিশুকে খুব দ্রুত এক ধরনের উদ্দীপনা থেকে আরেক ধরনের উদ্দীপনার দিকে নিয়ে যায়। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই নতুন ভিডিও, নতুন ছবি বা নতুন তথ্য সামনে আসে। বিপরীতে একটি বই পড়তে হলে একই জায়গায় কিছু সময় স্থির থাকতে হয়, ভাবতে হয় এবং তথ্যকে নিজের মধ্যে গুছিয়ে নিতে হয়।

তাই শিশুর পড়ার টেবিলে অস্থিরতাকে শুধু ‘পড়তে চায় না’ বলে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার একটি বড় অংশ অদেখাই থেকে যায়।

মাঠ হারালে শুধু খেলাই হারায় না

শহর বড় হচ্ছে, ভবন বাড়ছে, ব্যস্ততা বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে কমছে শিশুদের মুক্তভাবে খেলার জায়গা।

অনেক শিশুর দিন কাটছে স্কুল, কোচিং, বাড়ির কাজ এবং স্ক্রিনের মধ্যে। শারীরিক কর্মকাণ্ডের জন্য আলাদা সময় বের করা হচ্ছে না। অথচ শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কের বিকাশে নিয়মিত নড়াচড়া ও খেলাধুলার গুরুত্ব রয়েছে।

খেলার সময় শিশুরা শুধু দৌড়ায় না। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, সমস্যার সমাধান করে, অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, নিয়ম মেনে চলে এবং কখনো জেতে, কখনো হারে। অর্থাৎ মাঠও এক ধরনের শেখার জায়গা।

সেই মাঠ যখন শিশুর জীবন থেকে হারিয়ে যায়, তখন তার প্রভাব শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যে পড়ে না; দৈনন্দিন আচরণ, মেজাজ এবং শেখার অভ্যাসেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ওজন বাড়ছে, কমছে সক্রিয়তা

শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও যোগ হচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের সহজলভ্যতা শিশুদের খাদ্যাভ্যাসেও প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে সারাদিন বসে থাকা এবং পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম না থাকলে শরীরে অতিরিক্ত ওজন জমার ঝুঁকি বাড়ে। আইসিএমআর-এনআইএন-এর প্রতিবেদনেও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার বিষয়টিকেও তাই শুধু বাহ্যিক চেহারার পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। শিশুর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ একই জীবনযাত্রা একদিকে শিশুর শারীরিক সক্রিয়তা কমাচ্ছে, অন্যদিকে ওজন বাড়াচ্ছে এবং তৃতীয়দিকে পড়াশোনার সময় দীর্ঘ মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে সেই অদৃশ্য সংযোগ।

ঘুমও কি হারিয়ে যাচ্ছে?

শিশুর মনোযোগ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় প্রায়ই বাদ পড়ে—ঘুম।

রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল দেখা, বিছানায় শুয়েও ভিডিও দেখা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে স্ক্রিন ব্যবহার করতে করতে দেরি করে ঘুমানো—এসব অভ্যাস শিশুর বিশ্রামের স্বাভাবিক রুটিনকে ব্যাহত করতে পারে।

পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম না হলে পরদিন শিশুর ক্লান্তি, বিরক্তি কিংবা মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে।

তাই সকালে পড়তে বসে যে শিশুকে অমনোযোগী মনে হচ্ছে, তার আগের রাতের ঘুম কেমন হয়েছে—সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুকে বকাঝকা করার আগে কিছু প্রশ্ন

কোনো শিশু পড়তে না চাইলে প্রথমেই ‘তুমি পড়াশোনা করো না’, ‘তোমার কোনো মনোযোগ নেই’—এ ধরনের মন্তব্য করা সহজ। কিন্তু তার আগে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে।

সে প্রতিদিন কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে?

কতক্ষণ বাইরে খেলছে?

তার খাবারের তালিকায় কী আছে?

রাতে কখন ঘুমায়?

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সে কতটা সতেজ থাকে?

পড়াশোনার বাইরে তার আনন্দের বা সৃজনশীল কাজের সুযোগ কতটুকু?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো শিশুর অমনোযোগের পেছনে থাকা কারণগুলো বুঝতে সাহায্য করবে।

প্রযুক্তিকে শত্রু বানানোর দরকার নেই

এখনকার সময়ে শিশুকে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। পড়াশোনা, যোগাযোগ এবং তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা এবং কী উদ্দেশ্যে হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু যদি কোনো শিক্ষামূলক ভিডিও দেখে, অনলাইন ক্লাস করে বা কোনো অ্যাপের মাধ্যমে নতুন কিছু শেখে, সেটি এক ধরনের ব্যবহার। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে ভিডিও দেখা বা গেম খেলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

স্কুলেও একইভাবে প্রতিটি কাজের জন্য স্ক্রিনের ওপর নির্ভর না করে হাতে-কলমে শেখানো, দলগত কাজ, আলোচনা, বই পড়া এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

প্রযুক্তি যেন শেখার সহায়ক হয়, শিশুর পুরো জীবনযাপনের বিকল্প না হয়ে ওঠে—এই ভারসাম্যটাই সবচেয়ে জরুরি।

অভিভাবকের আচরণও বড় শিক্ষা

শিশুকে মোবাইল থেকে দূরে রাখতে গিয়ে যদি মা-বাবাই সারাক্ষণ ফোন হাতে থাকেন, তাহলে শুধু নিয়ম করে শিশুর আচরণ বদলানো কঠিন।

খাবারের টেবিলে সবাই ফোন ব্যবহার করলে শিশুও সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করবে। ঘুমানোর আগে পরিবারের সবাই যদি স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকে, তাহলে শিশুকে একা নিয়ম মানতে বলা কার্যকর নাও হতে পারে।

তাই পরিবর্তনটা শুধু শিশুর কাছ থেকে আশা করলে হবে না। পরিবারের দৈনন্দিন রুটিনেও কিছু পরিবর্তন আনতে হবে।

ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করা, খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা এবং প্রতিদিন কিছু সময় পরিবারের সবাই মিলে কথা বলা—এসব ছোট অভ্যাসও শিশুর জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

পড়াশোনার পাশাপাশি দরকার ‘অপড়াশোনার’ সময়

শিশুর প্রতিটি মুহূর্তকে পড়াশোনা দিয়ে ভরে দেওয়ার চেষ্টা অনেক সময় উল্টো ফল দিতে পারে।

বই পড়ার পাশাপাশি তাকে খেলতে দিতে হবে। আঁকতে দিতে হবে, গল্প করতে দিতে হবে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে দিতে হবে। এমনকি কিছু সময় একেবারে নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগও প্রয়োজন।

কারণ শেখা শুধু বইয়ের পাতায় হয় না। শিশুর চারপাশের পৃথিবী, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, খেলা, প্রশ্ন করা এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও সে শেখে।

তাই একটি শিশু পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার সুস্থ বিকাশের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।

অমনোযোগী শিশুকে নয়, বদলাতে হবে পরিবেশ

একটি শিশুর পড়াশোনায় মনোযোগ কমে গেলে তাকে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার প্রবণতা আমাদের বদলাতে হবে।

শিশুর আচরণ অনেক সময় তার চারপাশের পরিবেশের প্রতিফলন। অতিরিক্ত স্ক্রিন, কম শারীরিক কর্মকাণ্ড, অনিয়মিত ঘুম, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ—সব মিলেই তার দৈনন্দিন জীবনে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে বইয়ের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই সমাধান শুধু আরও বেশি পড়ানো কিংবা আরও বেশি বকাঝকা করা নয়।

বরং শিশুর দিনটাকে নতুন করে সাজাতে হবে—কিছুটা পড়াশোনা, কিছুটা খেলাধুলা, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার, সীমিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ স্ক্রিন ব্যবহার এবং পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ।

শিশুর মনোযোগ কেড়ে নেওয়া পরিবেশটি যদি আমরা বদলাতে পারি, তাহলে হয়তো পড়ার টেবিলে বসিয়ে তাকে বারবার ‘মনোযোগ দাও’ বলার প্রয়োজনও কমে আসবে।

কারণ একটি শিশুকে সব সময় মনোযোগী হতে শেখানোর চেয়ে, মনোযোগ ধরে রাখার মতো একটি জীবনযাপন তৈরি করে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।

Advertisements
অমনোযোগীপড়াশিশু