ভালোবাসা চান, তবু ভালোবাসা পেলে কেন দূরে সরে যান?

একজন আপন মানুষ চান, যার কাছে নির্দ্বিধায় মনের কথা বলা যায়, নিজের মতো থাকা যায় এবং নিরাপদ বোধ করা যায়। কিন্তু সত্যিই যখন কেউ কাছে আসেন, তখনই শুরু হয় অস্বস্তি। যত্ন পেলে সন্দেহ, ভালোবাসা পেলে ভয় এবং সম্পর্ক গভীর হওয়ার আগেই দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এর পেছনে কাজ করতে পারে অতীতের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় কিংবা নিজের প্রতি নেতিবাচক ধারণা।
শৈশব বা আগের কোনো সম্পর্কে ভালোবাসার সঙ্গে যদি কষ্ট, প্রত্যাখ্যান, অনিশ্চয়তা বা মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা জড়িয়ে থাকে, তাহলে মস্তিষ্ক পরবর্তী সম্পর্কেও ভালোবাসাকে পুরোপুরি নিরাপদ হিসেবে গ্রহণ করতে নাও পারে। আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন সম্পর্ককেও সম্ভাব্য আঘাতের উৎস হিসেবে দেখতে পারে।
আগের সম্পর্কে অন্য পক্ষের ছেড়ে যাওয়া বা প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতাও নতুন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তখন নতুন মানুষটি আন্তরিক হলেও মনে প্রশ্ন জাগে, ‘শেষ পর্যন্ত আমাকেও ছেড়ে যাবে না তো?’ ফলে ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করার চেয়ে সম্ভাব্য কষ্ট থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রবণতাই বেশি কাজ করে।
আত্মমূল্যায়নের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ‘আমাকে সত্যিই কেউ ভালোবাসবে কেন?’ কিংবা ‘কেউ আমাকে এতটা ভালোবাসতে পারে না’—এমন ধারণা থাকলে অন্যের আন্তরিকতাকেও সন্দেহ হতে পারে। পরিবার, সমাজের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার অনুভূতি এবং দীর্ঘদিনের নেতিবাচক বিচার থেকে এ ধরনের বিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে ‘অ্যাভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট’ বা এড়িয়ে চলার প্রবণতাও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের মানুষেরা যে ভালোবাসা বা ঘনিষ্ঠতা একেবারেই চান না, বিষয়টি এমন নয়। বরং সম্পর্ক গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চাপ কিংবা খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ফলে আবেগগত দূরত্ব বজায় রাখা বা অস্বস্তিকর কথোপকথন এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা যায়।
তবে ভালোবাসা গ্রহণ করাও শেখা সম্ভব। প্রথম ধাপ হলো নিজের আচরণের পেছনে থাকা ভয়কে চেনা। কেউ কাছে এলে কেন সন্দেহ হয়, কেন দূরে সরে যেতে ইচ্ছা করে এবং কোন পুরোনো অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে—এসব বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে দোষারোপ না করে নিজের প্রতিরক্ষামূলক আচরণকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার। প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং বা থেরাপির সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।
কেটি পেরির ‘আ থাউজেন্ড ইয়ারস’ গানের একটি পরিচিত প্রশ্ন—‘হাউ ক্যান আই লাভ হোয়েন আই অ্যাম অ্যাফ্রেইড?’ অর্থাৎ, ভয় থাকলে কীভাবে ভালোবাসা সম্ভব? ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সেই ভালোবাসা গ্রহণের ভয়—এই দ্বন্দ্বই অনেকের সম্পর্কের জটিলতার অন্যতম কারণ হতে পারে।



