অ্যাম্বুলেন্সের পথ নেই, মাকে চেয়ারে বসিয়ে কাঁধে ছুটলেন দুই ছেলে

বাঁশ, দড়ি আর একটি প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী স্ট্রেচার। সেই চেয়ারে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে আহত মাকে কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন দুই ছেলে। রাস্তার এমন বেহাল দশার কারণেই জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারেননি তারা। শেষ পর্যন্ত মাকে কাঁধে তুলে কর্দমাক্ত রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্থানীয় বাজারে পৌঁছান দুই ভাই। পরে সেখান থেকে ইজিবাইকে করে তাকে নেওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
মানবিক ও কষ্টদায়ক এই ঘটনাটি ঘটেছে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কাটলা ইউনিয়নের খিয়ারমামুদপুর গ্রামে। গত বৃহস্পতিবার সকালে পেঁপে গাছ ভেঙে পড়ে আহত হন গ্রামের বাসিন্দা ধীমান বসাকের স্ত্রী বৃদ্ধা তপতী রানী। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন হলেও গ্রামের একমাত্র সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে কোনো যানবাহন বাড়ির কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
জানা গেছে, খিয়ারমামুদপুর গ্রামের প্রধান সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের অনুপযোগী। বর্ষায় কাদায় সড়কটি পিচ্ছিল হয়ে যায়। কোথাও কোথাও এতটাই কাদা জমে যে হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য কোনো যানবাহন গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করার মতো পরিস্থিতি নেই।
বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির কাছে পেঁপে গাছ ভেঙে পড়ে আহত হন তপতী রানী। আঘাত পাওয়ার পর তার জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কোনো যানবাহন বাড়ির কাছে আনার উপায় ছিল না। ফলে বিপাকে পড়ে যান তার দুই ছেলে গৌতম বসাক ও উত্তম বসাক।
শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে দুই ভাই মিলে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার সংগ্রহ করেন। এরপর বাঁশ ও দড়ির সাহায্যে চেয়ারটিকে অস্থায়ীভাবে এমনভাবে তৈরি করেন, যাতে তাদের মাকে তাতে বসিয়ে বহন করা যায়। তপতী রানীকে চেয়ারে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে কাঁধে তুলে নেন দুই ভাই। এরপর কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল রাস্তা পেরিয়ে তারা স্থানীয় বাজারে পৌঁছান। সেখান থেকে একটি ইজিবাইকে করে আহত তপতী রানীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ছেলে উত্তম বসাক বলেন, এই রাস্তা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাই অত্যন্ত কষ্টকর। আহত মাকে নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় তাদের কী ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
উত্তম বসাক বলেন, ‘এ রাস্তা দিয়ে চলতে খুবই কষ্ট হয়। হামার মাক এই রাস্তা দিয়ে নিতে কি যে কষ্ট হলো, তা ওপরওয়ালা জানে আর আমি জানি। রাস্তাত খুবই কাদা। একে তো লাল মাটি, তার ওপর রাস্তা দিয়ে জমি চাষ করা ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার যায়, তাতে রাস্তা এক্কেবারে নষ্ট হইছে। হাঁটি আসার উপায় নাই। এইতনে হামরা দুই ভাই মিলে মায়োক বাঁশোত দড়ি বান্ধে চেয়ার বসে কান্ধোত (কাঁধ) করে এই রাস্তা পার করিছি।’
প্রায় চার কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা
সরেজমিনে দেখা যায়, খিয়ারমামুদপুর গ্রামের প্রায় চার কিলোমিটার সড়কের অবস্থাই একই রকম। কোথাও গভীর কাদা, কোথাও পিচ্ছিল মাটি। সড়কের এমন অবস্থায় কোনো যানবাহন চলাচল করা প্রায় অসম্ভব। এমনকি পথচারীদেরও অনেক জায়গায় কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুম এলেই এই সড়কের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। বৃষ্টিতে কাঁচা মাটির রাস্তা কাদায় পরিণত হওয়ায় গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ ব্যক্তি, বৃদ্ধ কিংবা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
শুধু অসুস্থ বা বয়স্ক মানুষই নন, রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে রাস্তার এমন অবস্থা থাকলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
স্থানীয়রা আরও জানান, শুকনো মৌসুমেও সড়কটি খুব একটা ভালো থাকে না। তখন ধুলোবালিতে চলাচল করতে হয়। আর বর্ষা শুরু হলে কাদা ও পানিতে পুরো সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার নিয়মিত চলাচলের কারণে কাঁচা সড়কটির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে বলে জানান তারা।
পাকা সড়কের দাবি স্থানীয়দের
কাটলা ইউনিয়ন বিএনপির যুববিষয়ক সম্পাদক সামছুল ইসলাম বলেন, খিয়ারমামুদপুর গ্রামে প্রায় তিন কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি দিয়ে চলাচলে গ্রামের মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, সড়কটি পাকা করার জন্য উপজেলা বিএনপির নেতাদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি জানানো হয়েছে। দ্রুত রাস্তাটি পাকা করা হলে গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে বলে মনে করেন তিনি।
ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য শুকুর আলী বলেন, রাস্তাটি পাকা করার বিষয়ে এর আগেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা প্রকৌশলীকে বিষয়টি জানানো হলেও দীর্ঘদিনেও রাস্তার কাজ শুরু হয়নি।
শুকুর আলী বলেন, ‘রাস্তাটি পাকা করার জন্য আগে থেকেই উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলীকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু হবে হবে বলে কয়েক বছর পার হয়ে গেছে। এবার সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ হোসেনকে জানানো হয়েছে। তিনি পাকা করার আশ্বাস দিয়েছেন।’



