২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

ঘরে ঘরে যখন জ্বর, জ্বর হলেই কি চিন্তার কারণ? কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন

fever

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে জ্বর-সর্দি-কাশি যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। পরিবারের একজন জ্বরে আক্রান্ত হলেই দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে অন্যদের মধ্যেও। কারণ, সব জ্বর এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে এটি সাধারণ ফ্লু, আবার কারও জ্বরের আড়ালে থাকতে পারে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া কিংবা আরও গুরুতর কোনো সংক্রমণ।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়—এটি শরীরে কোনো অসুস্থতার সংকেত। তাই শুধু থার্মোমিটারে তাপমাত্রা দেখে জ্বর কতটা বিপজ্জনক, তা বোঝা সব সময় সম্ভব নয়। রোগীর বয়স, জ্বর কত দিন ধরে আছে, অন্য কোনো উপসর্গ রয়েছে কি না, আগে থেকে কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে কি না এবং সাম্প্রতিক ভ্রমণের ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়েই পরিস্থিতি বিচার করতে হয়। তাই জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার ‘আরও দু-এক দিন দেখি’ ভেবে অবহেলা করাও ঠিক নয়।

ডেঙ্গুতে জ্বর কমার পরও বিপদ থাকতে পারে

ডেঙ্গুতে সাধারণত হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিরায় ব্যথা, বমিভাব এবং ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে ডেঙ্গুর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জ্বর কমে গেলেই যে রোগী বিপদমুক্ত, এমন নয়। বরং জ্বর সেরে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় বারবার বমি, তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, রক্তপাত, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা পানিশূন্যতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।

ডেঙ্গুতে সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েড সেবন করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা ও অন্যান্য শারীরিক সূচক পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
চিকুনগুনিয়ায় জ্বরের চেয়ে বেশি ভোগাতে পারে জয়েন্টের ব্যথা

চিকুনগুনিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র জয়েন্টের ব্যথা। জ্বরের সঙ্গে হাত-পায়ের বিভিন্ন গিরা ফুলে যেতে পারে, নড়াচড়া বা হাঁটাচলায় কষ্ট হতে পারে। মাথাব্যথা, পেশির ব্যথা, র‍্যাশ ও দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে জ্বর কয়েক দিনের মধ্যে কমে গেলেও জয়েন্টের ব্যথা দীর্ঘ সময় থাকতে পারে। কখনো কখনো এই ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী বাতজনিত সমস্যার রূপও নিতে পারে। তাই চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী সময়েও নজর রাখা জরুরি।

Advertisements

ফ্লু সাধারণ হলেও সবার জন্য সমান নয়

হঠাৎ জ্বর, সর্দি-কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা—এসব ফ্লুর পরিচিত লক্ষণ। বেশির ভাগ মানুষ বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সহায়ক চিকিৎসায় কয়েক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনির রোগ, ক্যানসার বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ফ্লু জটিল আকার নিতে পারে। নিউমোনিয়া কিংবা গুরুতর সংক্রমণও দেখা দিতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির জ্বরকে সাধারণ জ্বর ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

কয়েক দিন ধরে বাড়তে থাকা জ্বর হলে টাইফয়েডও ভাবতে হবে

টাইফয়েডের জ্বর অনেক সময় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং একটানা কয়েক দিন স্থায়ী হয়। এর সঙ্গে দুর্বলতা, মাথাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে অন্ত্রে রক্তক্ষরণ বা ছিদ্রসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই টানা কয়েক দিন জ্বর থাকার পরও যদি অবস্থার উন্নতি না হয়, সেটিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ধরে বসে থাকা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে কারণ নিশ্চিত করা জরুরি।

জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হলে সতর্ক

তীব্র জ্বরের সঙ্গে কাশি, কফ, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে নিউমোনিয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হয়। শুরুতে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো মনে হলেও কিছু ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শিশুদের বুক দেবে যাওয়া, ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলতেও কষ্ট হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার সঙ্গে জ্বর? কিডনির সংক্রমণও হতে পারে

মূত্রনালির সংক্রমণেও জ্বর হতে পারে। প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ কিংবা তলপেটে অস্বস্তি এর সাধারণ লক্ষণ। সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে জ্বরের সঙ্গে কাঁপুনি, বমি এবং কোমর বা পিঠের এক পাশে ব্যথা দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। তাই জ্বরের সঙ্গে প্রস্রাবের সমস্যাকে অবহেলা করা উচিত নয়।

জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা ও ঘাড় শক্ত? জরুরি চিকিৎসা দরকার

তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। মস্তিষ্কের গুরুতর সংক্রমণ যেমন মেনিনজাইটিস বা এনকেফালাইটিসের ক্ষেত্রে এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাড়িতে থেকে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

জ্বরের সঙ্গে চোখ-শরীর হলুদ হলে

জ্বরের পাশাপাশি ক্ষুধামান্দ্য, বমি, পেটব্যথা, চোখ বা শরীর হলুদ হয়ে যাওয়া এবং গাঢ় রঙের প্রস্রাব হলে হেপাটাইটিসের কথাও মাথায় রাখতে হবে। বিশেষ করে দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো কিছু ধরনের হেপাটাইটিস আমাদের দেশে পরিচিত। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া বা অনির্ভরযোগ্য চিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

দীর্ঘদিনের জ্বরও উপেক্ষা করবেন না

জ্বর যদি দীর্ঘ সময় ধরে থাকে এবং এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা বা রক্তশূন্যতার মতো উপসর্গ যুক্ত হয়, তাহলে যক্ষ্মাসহ দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার।

কোন লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি?

জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অচেতনতা, অস্বাভাবিক আচরণ, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া, শরীর নীলচে হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। একইভাবে ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জ্বর হলে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। বিশেষ করে অসুস্থতার সময় ডায়াবেটিসের রোগী নিজের ইচ্ছায় ইনসুলিন বন্ধ করলে গুরুতর বিপদ হতে পারে।

বয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বরের সময় হঠাৎ অচেতন হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা প্রলাপও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। আর সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ বা অন্য কোনো অঞ্চলে ভ্রমণ করা থাকলে চিকিৎসককে সেটি জানানো জরুরি। কারণ ভ্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সংক্রমণও জ্বরের কারণ হতে পারে।

জ্বর হলে কী করবেন?

শুধু জ্বরের মাত্রা দেখে রোগের কারণ নির্ধারণ করা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত, প্রস্রাব, কফ কিংবা ফুসফুসের পরীক্ষা করতে হতে পারে। তাই জ্বরের কারণ বুঝতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ পথ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজে থেকে কিংবা ওষুধের দোকানের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করা। ভুল অ্যান্টিবায়োটিক রোগ নিরাময়ের বদলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটাতে পারে এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সমস্যাও বাড়াতে পারে।

জ্বর মানেই আতঙ্কের কারণ নয়। কিন্তু শরীরের দেওয়া সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কয়েক দিনের সাধারণ জ্বর যেমন বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় সেরে যেতে পারে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে একই জ্বর গুরুতর অসুস্থতার প্রথম সংকেতও হতে পারে। তাই প্রয়োজন সচেতন থাকা, বিপদের লক্ষণগুলো চেনা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া।

Advertisements