প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে নির্মাণ খাতে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন নুজহাত শামা

বাংলাদেশের নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন খাতে গত এক দশকে নকশা, পরিকল্পনা ও নির্মাণপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখনও অনেকটাই প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল—নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ বা প্রকিউরমেন্ট।
প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এখনো একের পর এক সরবরাহকারীকে ফোন করা, হোয়াটসঅ্যাপে কোটেশন সংগ্রহ, দাম নিয়ে দর-কষাকষি, পণ্যের নমুনা দেখা, বারবার যোগাযোগ করা—এসবই যেন প্রতিদিনের বাস্তবতা। সময়সাপেক্ষ এই প্রক্রিয়ায় শুধু সময়ই নয়, শ্রম ও অর্থও অপচয় হয়।

এই সমস্যাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তরুণ স্থপতি নুজহাত শামা। একজন স্থপতি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, নির্মাণ খাতে প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে পুরো শিল্পখাতই আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও গতিশীল হয়ে উঠতে পারে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি চাকরির নিরাপদ গণ্ডি ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।
তবে তার উদ্যোগ কোনো প্রচলিত স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নয়। বরং তিনি তৈরি করেছেন ‘প্রো-কিউ’ (ProQ)—নির্মাণসামগ্রী কেনাবেচার জন্য একটি ডিজিটাল প্রকিউরমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যা স্থপতি, ডেভেলপার, ঠিকাদার, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার এবং ব্যক্তিগতভাবে বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী মানুষের জন্য পুরো ক্রয়প্রক্রিয়াকে সহজ ও স্বচ্ছ করে তুলতে কাজ করছে।
স্থাপত্য থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প
২০২২ সালে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন নুজহাত শামা। অসাধারণ ফলাফলের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ডিনস লিস্টে স্থান পান। এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম-এ গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন।
পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন র্যানকন ডেভেলপমেন্টসে। সেখানে বিভিন্ন স্থাপত্য ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন প্রকল্পে কাজ করার সময়ই নির্মাণ উপকরণ সংগ্রহের জটিল বাস্তবতা তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
তিনি লক্ষ্য করেন, একটি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ডিজাইনের কাজের চেয়েও বেশি সময় ব্যয় হয়। একাধিক সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ, কোটেশন সংগ্রহ, মূল্য যাচাই, দর-কষাকষি, নমুনা পরীক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত সঠিক পণ্য নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়াই হয়ে ওঠে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর।
তার বিশ্বাস, এই সময়টুকু যদি সৃজনশীল কাজের পেছনে ব্যয় করা যেত, তাহলে স্থাপত্য ও ডিজাইনের মান আরও উন্নত করা সম্ভব হতো।
সমস্যা থেকেই জন্ম নেয় সমাধান
কাজ করতে গিয়েই নুজহাত আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করেন। ফোনকল ও হোয়াটসঅ্যাপনির্ভর যোগাযোগের কারণে অনেক সময় তথ্য হারিয়ে যায়, কোটেশন পরিবর্তিত হয়, পণ্যের স্পেসিফিকেশন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় কিংবা সরবরাহের পর প্রত্যাশিত মানের পণ্য পাওয়া যায় না।
এই বাস্তবতা তাকে ভাবতে শেখায়—যদি পুরো প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়াটি একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা যায়, তাহলে এসব সমস্যার বড় অংশই দূর করা সম্ভব।
সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় প্রো-কিউ।
কীভাবে কাজ করবে ‘প্রো-কিউ’
প্রো-কিউয়ের ধারণা সহজ, কিন্তু কার্যকর।
এখানে একজন ক্রেতাকে আর আলাদা আলাদা সরবরাহকারীকে ফোন করে কোটেশন সংগ্রহ করতে হবে না। বিভিন্ন বিক্রেতা নিজেদের প্রোফাইলের মাধ্যমে পণ্যের তথ্য, স্পেসিফিকেশন ও মূল্য প্রদর্শন করবেন।
স্থপতি, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার কিংবা সাধারণ ক্রেতারা ওয়েবসাইট থেকেই বিভিন্ন পণ্যের বিস্তারিত তথ্য দেখতে পারবেন। এমনকি অনেক পণ্যের থ্রিডি মডেলও সংগ্রহ করা যাবে, যা ডিজাইন পরিকল্পনায় বাড়তি সুবিধা দেবে।
ক্রেতা প্রয়োজন অনুযায়ী একটি প্রকিউরমেন্ট রিকোয়েস্ট তৈরি করবেন। সেখানে প্রয়োজনীয় পণ্যের নাম, পরিমাণ, স্পেসিফিকেশন এবং প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য যুক্ত করবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা নিজেদের কোটেশন জমা দেবেন।
একই প্ল্যাটফর্মে একাধিক প্রস্তাব তুলনা করে ক্রেতা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। দর-কষাকষির সুযোগ থাকবে, পাশাপাশি আলোচনার প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
শুধু কেনাকাটা নয়, থাকবে ক্রেতার সুরক্ষাও
নুজহাত শামার মতে, প্রকিউরমেন্টের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ভালো দামে পণ্য পাওয়া নয়; বরং নিশ্চিত হওয়া যে সরবরাহ করা পণ্যটি চুক্তি অনুযায়ী হয়েছে কি না।
এই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে প্রো-কিউ।
প্ল্যাটফর্মটিতে যোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে রয়েছে বায়ার প্রোটেকশন পলিসি। অর্থাৎ অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ ছাড় করা হবে না। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে লেনদেন সম্পন্ন হবে।
যদি সরবরাহকৃত পণ্য স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে না মেলে কিংবা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে অভিযোগ জানানোর এবং সমাধান পাওয়ার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকবে।
বিক্রেতাদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা
প্রো-কিউ শুধু ক্রেতাদের সুবিধার জন্য নয়; বিক্রেতাদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে চায়।
বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন বা সরবরাহ করলেও ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সীমিত পরিচিতি কিংবা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাজারের কারণে তাদের ব্যবসার পরিধি ছোট থেকে যায়।
প্রো-কিউয়ের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান সহজেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র খাতের আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার কার্যক্রমও চলছে।
একজন নারীর দৃষ্টিতে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান
নুজহাত শামার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি সমস্যাটিকে বাইরের একজন ব্যবসায়ীর চোখে দেখেননি; দেখেছেন একজন ব্যবহারকারী হিসেবে।
নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা, বাজার গবেষণা এবং সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে তিনি প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন।
বিশেষ করে পণ্যের মান, নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা নির্বাচন, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং প্রতিশ্রুত পণ্য যথাযথভাবে নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।
দ্রুত ব্যবসা বড় করার পরিবর্তে তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তোলাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার আগে বিক্রেতাদের যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
স্বপ্ন শুধু একটি স্টার্টআপ নয়
নুজহাত শামার গল্প কেবল একজন স্থপতির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে কার্যকর সমাধান তৈরি করা যায়।
যে খাতে বছরের পর বছর ধরে একই পদ্ধতিতে কাজ হয়েছে, সেখানে নতুন চিন্তা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন একজন তরুণ নারী উদ্যোক্তা। তার লক্ষ্য শুধু একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা নয়; বরং নির্মাণ খাতের প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং আধুনিক করে তোলা।
www.proq.com.bd ঠিকানায় প্ল্যাটফর্মটির শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। খুব শিগগিরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন নুজহাত শামা।



