সমকামিতা কি জন্মগত? গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা

মানুষের যৌন অভিমুখিতা বা যৌন আকর্ষণকে ঘিরে চিকিৎসাবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানে বহু বছর ধরে গবেষণা ও আলোচনা চলছে। সমকামিতা (Homosexuality) বা সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌন ও রোমান্টিক আকর্ষণ এমনই একটি বিষয়, যা নিয়ে সমাজে এখনও নানা ভুল ধারণা, কুসংস্কার এবং বিতর্ক বিদ্যমান।

অনেকেই জানতে চান—সমকামিতা কি কোনো মানসিক রোগ? মানুষ কেন সমকামী হয়? এটি কি জন্মগত, নাকি পরে গড়ে ওঠে? আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এ বিষয়ে কী বলছে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
সমকামিতা কি মানসিক রোগ?
বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মতে, সমকামিতা কোনো মানসিক রোগ, বিকার বা মানসিক ব্যাধি নয়। বরং এটি মানুষের যৌন অভিমুখিতার একটি স্বাভাবিক জৈবিক বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মনোবিজ্ঞানভিত্তিক সংগঠন আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) ১৯৭৩ সালে সমকামিতাকে মানসিক রোগের তালিকা থেকে বাদ দেয়। পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯০ সালে তাদের আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণীকরণ (ICD) থেকেও সমকামিতাকে বাদ দেয় এবং এটিকে রোগ হিসেবে গণ্য করার ধারণাকে বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষমকামিতা (Heterosexuality) যেমন মানুষের একটি স্বাভাবিক যৌন অভিমুখিতা, সমকামিতাও তেমনি মানব আচরণের একটি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।

মানুষ কেন সমকামী হয়?
কোনো ব্যক্তি কেন সমকামী, বিষমকামী বা অন্য কোনো যৌন অভিমুখিতার অধিকারী হন—এ বিষয়ে এখনো একক বা চূড়ান্ত কোনো কারণ বিজ্ঞান নির্ধারণ করতে পারেনি।
তবে ২০১৯ সালের ৩০ আগস্ট বিজ্ঞান সাময়িকী Science-এ প্রকাশিত একটি বৃহৎ গবেষণায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সমকামিতার জন্য দায়ী এমন কোনো একক ‘গে জিন’ নেই। বরং শত শত জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত নানা উপাদানের সম্মিলিত প্রভাব একজন মানুষের যৌন অভিমুখিতা গঠনে ভূমিকা রাখে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন এমআইটি ও হার্ভার্ডের ব্রড ইনস্টিটিউটের গবেষক ডা. বেন নিয়ালে এবং গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ছিলেন আন্দ্রেয়া গান্না।
গবেষকদের মতে, যৌন অভিমুখিতা নির্ধারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করতে পারে—
জেনেটিক বা বংশগত প্রভাব: ডিএনএ ও ক্রোমোজোমের কিছু বৈশিষ্ট্য মানুষের যৌন আকর্ষণের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
গর্ভকালীন হরমোনের ভূমিকা: ভ্রূণের মস্তিষ্ক বিকাশের সময় বিভিন্ন হরমোন, বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন বা এন্ড্রোজেনের মাত্রা ভবিষ্যতের যৌন অভিমুখিতার ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশ ও স্নায়ুবিক বিকাশ: শৈশবের মানসিক বিকাশ, পারিবারিক পরিবেশ এবং স্নায়ুতাত্ত্বিক কিছু বিষয়ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
সান্নিধ্যে থাকলেই কি কেউ সমকামী হয়ে যায়?
সমাজে প্রচলিত একটি বড় ভুল ধারণা হলো—সমকামী মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলে বা তাদের সংস্পর্শে থাকলে অন্যরাও সমকামী হয়ে যেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। যৌন অভিমুখিতা কোনো সংক্রামক বিষয় নয় এবং এটি অন্যের সংস্পর্শে এসে পরিবর্তিত হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ইন্সটিটিউট ফর ম্যারিটাল হিলিং-এর পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রিচার্ড ফিটজগিবনসের মতে, মানুষ সাধারণত কৈশোর বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের সহজাত যৌন আকর্ষণ সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করে। অর্থাৎ এই অনুভূতি হঠাৎ তৈরি হয় না; বরং ব্যক্তি ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক আকর্ষণকে উপলব্ধি করেন।
তার সাক্ষাৎকারভিত্তিক বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সমকামিতা কোনো সংক্রামক বৈশিষ্ট্য নয় এবং এটি অন্যের প্রভাবে সৃষ্টি হয়—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের চিকিৎসা কি কার্যকর?
বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান বর্তমানে তথাকথিত ‘কনভার্সন থেরাপি’ বা জোরপূর্বক যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে বৈজ্ঞানিকভাবে অকার্যকর এবং ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এমন জোরপূর্বক চিকিৎসা বা মানসিক চাপের কারণে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধের অবনতি এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
এই কারণে বিশ্বের বহু স্বাস্থ্যসংস্থা এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি নিরুৎসাহিত করে।
সামাজিক বাস্তবতা ও করণীয়
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ এবং বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কারণে সমকামিতা এখনও ব্যাপকভাবে অগ্রহণযোগ্য। এর ফলে সমকামী ব্যক্তিরা প্রায়ই সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক চাপ এবং মানসিক সংকটের মুখোমুখি হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, মানবিক আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
পরিবারে সহমর্মিতা
পরিবারে কেউ সমকামী হলে তাকে অপমান, নির্যাতন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে সহমর্মিতার সঙ্গে আচরণ করা উচিত। কারণ প্রত্যাখ্যান ও বৈষম্য একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রয়োজন হলে পেশাদার কাউন্সেলিং
যদি কেউ সামাজিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতায় ভোগেন, তাহলে অভিজ্ঞ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে কাউন্সেলিং নেওয়া উপকারী হতে পারে। এতে মানসিক স্থিতি ও আত্মবিশ্বাস বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পরিহার
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের নামে কবিরাজি, ওঝা, অবৈজ্ঞানিক ওষুধ কিংবা হরমোন পরিবর্তনের মতো কোনো পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এসব পদ্ধতি শারীরিক ও মানসিক—উভয় দিক থেকেই ক্ষতিকর হতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমকামিতা কোনো মানসিক রোগ নয়; এটি মানুষের যৌন অভিমুখিতার একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য। তবে বিভিন্ন দেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনি বাস্তবতা একেক রকম হওয়ায় বিষয়টি এখনও সংবেদনশীল।
তাই এ বিষয়ে ভুল ধারণা বা কুসংস্কারের পরিবর্তে বিজ্ঞানসম্মত তথ্য, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপরই বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন।



