সরকারি হাসপাতালে ৫২% রোগনির্ণয় যন্ত্র থেকেও নেই

সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক রোগনির্ণয় যন্ত্র থাকলেও সেগুলোর বড় একটি অংশ নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে সেবা থাকলেও বাস্তবে রোগীরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে জরুরি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতিও উদ্বেগজনক বলে উঠে এসেছে এক গবেষণায়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে থাকা রোগনির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশ গত এক বছরে ব্যবহারই হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন স্তরের হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের গড় প্রাপ্যতা মাত্র ২২ শতাংশ।
বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সাত সদস্যের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। গবেষণায় অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।
গবেষণাটি নয় মাস ধরে দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে জরিপ, সাক্ষাৎকার ও নথি বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। এতে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালের সেবা মূল্যায়ন করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগনির্ণয় সেবার কাগজে-কলমে প্রাপ্যতা ৬৫ শতাংশ হলেও গত এক বছরে নিয়মিত সেবা পাওয়া গেছে মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে। জেলা হাসপাতালগুলোতে এ ধরনের সেবার প্রাপ্যতা ৮৫ শতাংশ হলেও নিয়মিত কার্যকর ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার প্রাপ্যতা ৪৬ শতাংশ হলেও নিয়মিত সেবা মিলেছে ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে। অন্যদিকে মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রাপ্যতা ৫৪ শতাংশ হলেও নিয়মিত সেবা চালু ছিল মাত্র ২৫ শতাংশ।
সেবা ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে গবেষণায় উঠে এসেছে যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে থাকা। মোট ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্র অচল থাকায় সেবা বন্ধ ছিল। এছাড়া প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের অভাবে ১৪ শতাংশ এবং প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট না থাকায় ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সেবা ব্যাহত হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত ৬ হাজার ৪০৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩ হাজার ৮৯২ জন। ফলে প্রায় ৪০ শতাংশ পদ খালি রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ১২ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৩৬ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও অনেক জায়গায় সেগুলো পরিচালনার মতো জনবল নেই।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত সবচেয়ে কম মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে, যেখানে চাহিদার তুলনায় মাত্র ১২ শতাংশ ওষুধ পাওয়া যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ হার ২৩ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের হাসপাতালের বাইরে নির্ভর করতে হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালের ওষুধের বড় অংশ সরবরাহ করে এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। তবে চাহিদা পূরণে হাসপাতালগুলোকে প্রায় ৩৩ শতাংশ ওষুধ অন্য উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আরও ৫ শতাংশ ওষুধ আসে বিভিন্ন বিকল্প উৎস থেকে, যা কেন্দ্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে গজ, তুলা, সিরিঞ্জ ও গ্লাভসের মতো নিয়মিত ব্যবহারের সামগ্রী বেশির ভাগ হাসপাতালে থাকলেও জরুরি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে টুর্নিকেট, ৫৫ শতাংশে ব্যাগ-ভাল্ভ-মাস্ক (রিসাসিটেটর) এবং ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নবজাতকের নাভির ক্ল্যাম্প পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, জরুরি ও নবজাতকের চিকিৎসায় এসব সরঞ্জামের অনুপস্থিতি রোগীর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পরিকল্পনার অভাবে বহু মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্র বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্টের অভাব এবং পরিকল্পনাহীন কেনাকাটার কারণে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, শুধু গবেষণা বা নীতিমালা প্রণয়ন করলেই স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা দূর হবে না। সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে চিকিৎসকেরা যদি বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠিয়ে কমিশনভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন, তাহলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।



