৭৪ বছর পর মিলল আটলান্টিকে বিধ্বস্ত সেই বিমানের ধ্বংসাবশেষ

উড্ডয়নের মাত্র ৯ মিনিট পর আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হওয়া প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের ডগলাস ডিসি-৪ ফ্লাইট ৫২৬এ-এর ধ্বংসাবশেষ অবশেষে শনাক্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার ৭৪ বছর পর সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে আধুনিক সোনার প্রযুক্তি ও পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোনের সাহায্যে ধ্বংসাবশেষটি খুঁজে পেয়েছে অনুসন্ধানকারী দল।
১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১১ মিনিটে পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ানের ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে বিমানটি। উড্ডয়নের মাত্র ৯ মিনিট পর এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে আছড়ে পড়ে।
বিমানটিতে ৬৪ জন যাত্রী এবং পাইলটসহ পাঁচজন ক্রু সদস্য ছিলেন। দুর্ঘটনার পর মাত্র ১৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকিরা প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই বিমানটি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যায়।
দীর্ঘদিনের ব্যর্থ অনুসন্ধানের পর ডিসকভারি চ্যানেলের ‘এক্সপেডিশন আননোন’ দলের সদস্যরা ‘এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ ও ‘ডিপ সি ভিশন’-এর সহযোগিতায় ধ্বংসাবশেষটি শনাক্ত করেন। পুয়ের্তো রিকোর উত্তর উপকূল থেকে কিছু দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে এটি পাওয়া গেছে।
এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সভাপতি রাস ম্যাথিউস বলেন, এই আবিষ্কারে তারা যেমন বিস্মিত, তেমনি উচ্ছ্বসিত। একই সঙ্গে এত বছর আগে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাকে তারা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
অনুসন্ধানকারীরা জানান, উচ্চ রেজল্যুশনের সোনার প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের ড্রোন ব্যবহার করে ধ্বংসাবশেষের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে বহুবার অনুসন্ধান চালানো হলেও কোনো সাফল্য মেলেনি। এমনকি ২০২৪ সালের একটি অভিযানও ব্যর্থ হয়েছিল।
তদন্তে জানা যায়, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটিই ছিল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই তিন নম্বর ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। সে সময় বিমানটির উচ্চতা ছিল মাত্র ৩৫০ ফুট। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাইলট ক্যাপ্টেন জন সি. বার্ন বিমানটি পুয়ের্তো রিকোয় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ৫৫০ ফুট পর্যন্ত ওপরে তুলতে সক্ষম হন। কিন্তু এর পরপরই চার নম্বর ইঞ্জিনও বিকল হয়ে যায়। ফলে বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে সমুদ্রে পড়ে যায়।
জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ক্যাপ্টেন বার্ন সমুদ্রে বিমান অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডকে নিজের অবস্থান জানান। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বিমানটি পানিতে নামে। আঘাতের সময় এটি দুই টুকরো হয়ে গেলেও শুরুতে অনেক যাত্রী জীবিত ছিলেন। তারা বিমানের ভাঙা অংশ ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। তবে উত্তাল ঢেউ ও ঠান্ডা পানির কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয় এবং অনেককে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এই দুর্ঘটনার পর সমুদ্রপথে চলাচলকারী বিমানের যাত্রীদের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে বাঁচার প্রশিক্ষণ, উড্ডয়নের আগে নিরাপত্তা নির্দেশনা প্রদান এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বিধি বাধ্যতামূলক করা হয়।
তদন্তে আরও জানা যায়, দীর্ঘদিন বিমানের ইঞ্জিনগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি এবং কয়েকটি যন্ত্রাংশে ত্রুটি থাকলেও তা উড্ডয়নের আগে শনাক্ত হয়নি। শেষ পর্যন্ত যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকেই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ক্যাপ্টেন জন সি. বার্নকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধানকারীরা সমুদ্রের তলদেশে ধ্বংসাবশেষের অন্তত সাড়ে তিন লাখ ছবি তুলেছেন। তবে দুর্ঘটনায় নিহতদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।



