১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

তিন দশকের বন্ধুত্ব— ডিএনএ টেস্টে তারা দুই বোন

তিন দশকের বন্ধুত্ব— ডিএনএ টেস্টে তারা দুই বোন

প্রায় ৩০ বছর ধরে সবচেয়ে ভালো বন্ধু (বেস্টফ্রেন্ড) দুই নারী ৪০ বছর বয়সে এসে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে জানতে পারেন, তারা একে অপরের আপন বোন। এটি কোনো বলিউড সিনেমা নয় বরং নেদারল্যান্ডে দত্তক সন্তান হিসেবে বড় হওয়া দুই ভারতীয় নারীর বাস্তব জীবনের গল্প।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী মীনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজসেনের জন্ম ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুম্বাইয়ের দুটি আলাদা অনাথ আশ্রম থেকে তাদের দত্তক নেন নেদারল্যান্ডসের দুটি আলাদা পরিবার।

নতুন দেশে শিশু বয়স থেকেই একে অপরের কাছাকাছি এলাকাতে বড় হয়েছেন মীনা ও মিনাল। কিশোরী বয়সে প্রথম তাদের দেখা হয় দত্তক সংস্থার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। সেখানেই তারা প্রথম একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হন। তখনই তাদের চেহারা ও আচরণের অদ্ভুত মিল দেখে দুজনেই বিস্মিত হয়েছিলেন।

বর্তমানে ৪৩ বছর বয়সী মীনা জানান, সেই দিনের কথা এখনো তার স্পষ্ট মনে আছে। তিনি বলেন, ‘সংস্থাটি সব দত্তক নেওয়া শিশুদের একত্র করেছিল, যাতে তারা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, সময় কাটাতে পারে এবং একসঙ্গে রাতের খাবার খেতে পারে।’

সেদিন মীনা ও মিনাল দুজনেই নিজ নিজ বন্ধুদের সঙ্গে ছিলেন। তাদের বন্ধুরাই প্রথম লক্ষ্য করেন, দুজনের চেহারায় অবিশ্বাস্য মিল রয়েছে।

মীনা বলেন, ‘তারা বলেছিল, আয়নায় নিজেদের দেখ। আমি বলেছিলাম, ওমা! ওর (মিনাল) নাকটা আমার মতো! আমাদের হাসিও একই রকম। রাতের খাবারের পুরো সময় আমি শুধু ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।’

Advertisements

বিষয়টিকে কেবলই কাকতালীয় ঘটনা ভেবে নেন তারা। পরদিন দুই কিশোরী একে অপরের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন এবং যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।

তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্কের কোনো প্রমাণ না থাকলেও প্রথম দেখাতেই গভীর এক বন্ধন তৈরি হয়েছিল। বছরের পর বছর তারা একে অপরকে চিঠি লিখতেন। এমনকি একে অপরকে ‘বোন’ বলেও সম্বোধন করতেন। মীনা বলেন, ‘কোনো এক অজানা কারণে আমরা নিজেদের বোনের মতোই অনুভব করতাম।’

তারা চিঠিতে স্কুল, বন্ধু, প্রেম, ঘুরতে যাওয়া ও নাচ নিয়ে আলোচনা করতেন। নিজেদের পছন্দের খেলাধুলা সম্পর্কে জানাতেন এবং সংগীত নিয়েও কথা বলতেন। পরে তারা জানতে পারেন, দুজনেরই প্রিয় ব্যান্ড ছিল ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ।

কিন্তু ১৫ বছর আগে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল নেদারল্যান্ডস থেকে চলে যান ফ্রান্সে। আর মীনা তখন প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন, ফলে তিনিও পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

এরপর ২০১৭ সালে মীনা ভারত থেকে দত্তক নেওয়া শিশুদের নিয়ে একটি বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে নিজেদের প্রকৃত পরিবারের সন্ধান পেতে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পেরে তিনি নিজেও পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে ওই পরীক্ষায় তিনি কারও সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাননি। চলতি বছরের শুরুতে মোবাইল ফোনের জায়গা খালি করতে তিনি ওই পরীক্ষার অ্যাপটিও মুছে ফেলেন।

এরপর হুট করেই গত ২০ মে মীনার ফেসবুকে মিনালের কাছে থেকে একটি ক্ষুদে বার্তা আসে। মিনাল জিজ্ঞেস করেন—‘আমাকে মনে আছে?’

এর আগে এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে মিনাল ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন। তিনি সেই পরীক্ষার ফলাফলের একটি ছবি মীনাকে পাঠান। তার ধারণা ছিল, বাহ্যিক গঠনে মিল থাকায় এবং দুজনই দত্তক নেওয়া শিশু হওয়ায় তাদের পরিবার কোনোভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।

মীনা বলেন, ‘আমি ওই মেসেজ পেয়ে আবার অ্যাপটি চালু করি। এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর লগইন করতে পেরেছিলাম।’
ফলাফল ছিল একেবারে স্পষ্ট। দুই নারীর ডিএনএ ‘১০০ শতাংশ’ মিলে যায়।

মীনা বলেন, ‘আমার একজন আপন বোন পাওয়া গেছে। আমাদের একই জৈবিক মা ও বাবা। এর অর্থ হলো, আমরা একই দম্পতির ঔরসজাত সন্তান।’

‘এটা যেন হঠাৎ শরীরে অ্যাড্রেনালিনের প্রবাহের মতো অনুভূতি ছিল। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মিনাল ছিল আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ধাঁধার অংশ, যার অপেক্ষায় আমি এত বছর ছিলাম। আমরা একে অপরকে বোন বলে ডাকতাম। ডিএনএ পরীক্ষার ফল প্রমাণ করল, আমাদের একে অপরের প্রতি সেই সব অনুভূতি সঠিক ছিল’, যোগ করেন তিনি।

আগস্টের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে বহু বছর পর প্রথমবারের মতো তারা আবার দেখা করেন। তবে এবার তারা জানতেন, তারা শুধু পুরোনো বন্ধু নন, আপন বোন।

মীনা বলেন, ‘এটা অসাধারণ অনুভূতি ছিল। মনে হয়েছিল আমি ঘরে ফিরে এসেছি। বছরের পর বছর ধরে প্রকৃত পরিবারের অভাবে আমাদের হৃদয়ে একটি বড় শূন্যতা ছিল। এখন মনে হচ্ছে আমরা সম্পূর্ণ হয়েছি। সবকিছু এখন ঠিক যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবেই মনে হচ্ছে।’

তাদের আবেগঘন পুনর্মিলন নিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, তাদের সাক্ষাতে কান্না, আলিঙ্গন ও হাসি ছিল। এরপর তারা একসঙ্গে প্রথম ছবি তোলেন।

ফ্রান্সে সঙ্গী ও দুই ছেলের সঙ্গে থাকা ৪৪ বছর বয়সী মিনাল বলেন, এপ্রিল মাসে ডিএনএ পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি, যার সঙ্গে তার মিল পাওয়া গেছে, সেই একই কিশোরী মেয়েটি ঠিক সেই মেয়ে যে ৩০ বছর আগে প্রথম সাক্ষাতে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা ছবিগুলো দেখার পর বিষয়টি তার কাছে পরিষ্কার হয়। মিনাল বলেন, ‘মীনা আমার বোন। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমরা বোন হওয়ার আগে বন্ধু ছিলাম। আমরা জন্মের পর থেকেই বোন ছিলাম, শুধু জানতাম না।’

মীনা জানান, দত্তক নেওয়ার পর তিনি নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে বেড়ে ওঠেন। তার দত্তক বাবা-মা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।

তিনি বলেন, ‘তারা আমার শিক্ষকও ছিলেন। তারা খুব ভালোবাসাপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষ ছিলেন। কয়েক বছর আগে বাবা মারা গেছেন। তবে মা এখনো একই গ্রামে থাকেন। আমরা প্রতিদিন কথা বলি। তিনি এখনো আমার নিরাপদ আশ্রয়।’

মীনার দত্তক বাবা-মা গোয়া থেকে আরও একজন ছেলে শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে নিয়ে ২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মীনা নিজের বসবাস করা মুম্বাইয়ের ওই অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা দুই সপ্তাহ ধরে নথিপত্র খুঁজে দেখেন, যাতে মীনার প্রকৃত বাবা-মায়ের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।

মীনা বলেন, ‘আমার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আমি কোথা থেকে এসেছি তা জানা। কিন্তু অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষ তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।’

মে মাসের পর থেকে মীনা ও মিনাল প্রায় এক দিন পরপর কথা বলছেন। তারা একে অপরের জীবনসঙ্গী, সন্তান, ভাই ও দত্তক বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন।

মীনা বলেন, ‘সবাই লক্ষ্য করে, আমরা কীভাবে একে অপরের বাক্য শেষ করি, কীভাবে মাথা নাড়ি বা হাঁটি- সবকিছুতেই আমাদের মিল রয়েছে।’

তারা যে সহোদর বোন, এই সত্য এখনো পুরোপুরি অনুভব করে উঠতে সময় লাগছে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা দুই ঘণ্টা কথা বলি এবং সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলি। হঠাৎ মনে পড়ে, আমাদের বাজার করতে হবে বা সন্তানদের স্কুল থেকে নিতে হবে।’

মীনা জানান, যে জায়গা থেকে তাদের গল্প শুরু হয়েছিল, সেখানে আবার দুজন একসঙ্গে ফিরে যেতে চান।

তিনি বলেন, ‘আমরা একদিন একসঙ্গে ভারতে যেতে চাই, মুম্বাইয়ের রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে চাই। এমন সময় গেছে, যখন আমরা দুজনেই খুব একাকী অনুভব করেছি। যেমন আমি যখন বাবাকে হারিয়েছি বা প্রেম ভেঙেছে। আমার আফসোস হয়, তখন আমরা একে অপরের পাশে থাকতে পারিনি। আমরা হয়তো সুখ ভাগ করে নিতে পারতাম, কঠিন সময়ে একে অপরকে সহায়তা করতে পারতাম।’

Advertisements