অবিশ্বাস্য! এবার কুকুর-বিড়ালের কথাও বুঝবে মানুষ?

ভাবুন তো, একদিন সকালে আপনার পোষা কুকুরটি ঘেউ ঘেউ না করে জানিয়ে দিল, “আজ একটু পার্কে হাঁটতে যেতে চাই।” কিংবা বিড়ালটি এসে বলল, “সোফার নিচে একটি টিকটিকি লুকিয়ে আছে!” শুনতে যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির দৃশ্য। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতির কারণে এমন সম্ভাবনাকে আর পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ডিজনির জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র Up-এর ‘ডাগ’ নামের কুকুরটির কথা অনেকেরই মনে আছে। একটি বিশেষ স্মার্ট কলার তার ভাবনাকে মানুষের ভাষায় অনুবাদ করে দিত। এত দিন বিষয়টি ছিল নিছক কল্পনা, কিন্তু বাস্তবের গবেষণাগারগুলো এখন সেই স্বপ্নকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
প্রাণীর ভাষা বুঝতে চায় বিজ্ঞান
পোষা প্রাণীর মালিকদের একটি সাধারণ প্রশ্ন—কুকুরটি কেন বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে? বিড়ালটি কেন হঠাৎ মিউ মিউ শুরু করে? পাখির ডাকের পেছনে কী বার্তা লুকিয়ে থাকে?
এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর এখনও বিজ্ঞান দিতে পারেনি। তবে আধুনিক এআই, উন্নত শব্দ বিশ্লেষণ প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী কম্পিউটিং ব্যবস্থার সাহায্যে প্রাণীদের শব্দ ও আচরণের অর্থ খুঁজে বের করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোজেনেটিসিস্ট এরিখ জারভিস মনে করেন, ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে আরও কার্যকর ভাষাগত যোগাযোগ সম্ভব হতে পারে। তার মতে, একদিন হয়তো এমন স্মার্ট কলার বা মোবাইল অ্যাপ তৈরি হবে, যা কুকুরের ঘেউ ঘেউ, বিড়ালের মিউ মিউ কিংবা অন্য প্রাণীর শব্দ বিশ্লেষণ করে মানুষের ভাষায় অর্থ জানিয়ে দেবে। প্রাণীদেরও আছে নিজস্ব যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের মতো ব্যাকরণসমৃদ্ধ ভাষা না থাকলেও প্রাণীরা একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে। ভয়, আনন্দ, ক্ষুধা, বিপদের সংকেত কিংবা সঙ্গীকে ডাক—সবকিছুর জন্যই তাদের রয়েছে নিজস্ব শব্দ, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, সমস্যাটি প্রাণীদের ভাষা না থাকা নয়; বরং আমরা এখনও সেই ভাষা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
এরিখ জারভিস একটি মজার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় হারিয়ে যাওয়া একটি টিয়া পাখি কয়েক বছর পর ফিরে এসে স্প্যানিশ ভাষার শব্দ উচ্চারণ করতে শুরু করেছিল। যদিও এমন ঘটনা খুবই বিরল, এটি প্রাণীদের শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
সব প্রাণীর যোগাযোগের ক্ষমতা এক রকম নয়। কিছু প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত উন্নত হলেও তারা মানুষের মতো জটিল শব্দ তৈরি করতে পারে না।
ভার্ভেট বানর তার একটি উদাহরণ। তাদের চিন্তাশক্তি বেশ ভালো হলেও জটিল স্বরযন্ত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের মতো বহুমাত্রিক শব্দ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
বিজ্ঞানীদের মতে, তাই লক্ষ্য প্রাণীদের মানুষ বানানো নয়; বরং তারা নিজেদের মধ্যে কীভাবে যোগাযোগ করে, সেই ব্যবস্থাকে বুঝে ফেলা। তিমির সঙ্গে ‘হ্যালো’ প্রাণীর ভাষা নিয়ে গবেষণায় ইতোমধ্যে এসেছে কিছু আশাব্যঞ্জক সাফল্য।
২০২৩ সালে গবেষকেরা আলাস্কার একটি হাম্পব্যাক তিমির সঙ্গে শব্দ বিনিময়ের একটি পরীক্ষায় অংশ নেন। তারা তিমির নির্দিষ্ট ধরনের একটি শব্দ বিশ্লেষণ করে সেটিকে ‘হ্যালো’ ধরনের সম্ভাষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এরপর মানুষ ও তিমির মধ্যে কয়েক দফা একই ধরনের শব্দ আদান-প্রদান হয়।
পরবর্তী বিশ্লেষণে গবেষকেরা দেখতে পান, তিমির যোগাযোগব্যবস্থার কিছু পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্য মানুষের ভাষার সঙ্গে বিস্ময়কর মিল রাখে। ফলে ভবিষ্যতে আরও জটিল বার্তা বিশ্লেষণের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
এরিখ জারভিসের গবেষণাগারে জিনগতভাবে পরিবর্তিত কিছু ইঁদুর নিয়ে পরীক্ষা চলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের NOVA1 প্রোটিনের সংস্করণ বহনকারী ইঁদুর তুলনামূলকভাবে আরও জটিল ধরনের শব্দ উৎপাদন করতে পারে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, ইঁদুর মানুষের মতো কথা বলতে শিখে গেছে। তবে গবেষকেরা বলছেন, প্রাণীদের যোগাযোগব্যবস্থা বোঝার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা আসলে আমরা আজও অনেক প্রাণীর অনুভূতি কিছুটা বুঝতে পারি। ক্ষুধার্ত বিড়ালের ডাক, মালিককে দেখে কুকুরের আনন্দে লেজ নাড়া কিংবা বিপদ টের পেয়ে পাখির সতর্ক সংকেত—এসব বোঝার জন্য বিশেষ প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না।
কিন্তু যদি একদিন এআই সত্যিই প্রাণীদের শব্দ, আচরণ ও সংকেতকে মানুষের ভাষায় অনুবাদ করতে পারে, তাহলে শুধু পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়াই সহজ হবে না; বন্য প্রাণীর আচরণ, সংরক্ষণ এবং প্রাণিজগত নিয়ে গবেষণায়ও শুরু হবে এক নতুন যুগ।
বিজ্ঞান এখনও সেই গন্তব্যে পৌঁছায়নি। তবে গবেষণার বর্তমান গতি বলছে, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যকার ভাষার দূরত্ব হয়তো আর খুব বেশি দিনের জন্য অজানাই থাকবে না।



