নয় দিন পর খুলেছে সাজেক, মেঘ-পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটকরা

সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে সাদা মেঘের ভেলা, কখনো মেঘে ঢাকা জনপদ, আবার মুহূর্তেই উন্মোচিত দূরের পাহাড়ের সারি—বর্ষা এলেই যেন নতুন রূপে ধরা দেয় সাজেক ভ্যালি। আর সেই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষ।

টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কায় নয় দিন বন্ধ থাকার পর গত বুধবার থেকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিসহ আশপাশের সব পর্যটনকেন্দ্র আবারও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর থেকেই পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। তবে প্রশাসন ভ্রমণকারীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানিয়েছেন, বর্ষাকালে সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ বিবেচনায় সাময়িক ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের সময় আবহাওয়া ও প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের মিজোরাম সীমান্তঘেঁষা সাজেক ভ্যালি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি গন্তব্য। প্রশাসনিকভাবে এটি রাঙামাটির অংশ হলেও পর্যটকদের অধিকাংশই খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেকে যাতায়াত করেন।

সাজেকে প্রবেশের পর প্রথমেই চোখে পড়ে রুইলুই পাড়া। প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রামে মূলত লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। আরও ভেতরে রয়েছে কংলক পাড়া, যা সাজেকের শেষ গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে ভারতের মিজোরামের পাহাড় স্পষ্ট দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, রুইলুই ও কংলক থেকে সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাতে হাঁটাপথে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
বর্ষাকালে সাজেকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পাহাড়ের গায়ে নেমে আসা মেঘ। অনেক সময় পুরো এলাকা মেঘে ঢেকে যায়, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে দেখা দেয় সবুজ পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। প্রকৃতির এই রূপ বদলের খেলাই বর্ষায় সাজেককে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এ কারণে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বর্ষায় পর্যটকের সংখ্যাও বেড়ে যায়।
খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৬৯ কিলোমিটার। এই পথে কাচালং ও মাচালং নদী, পাহাড়ি জনপদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা এবং সবুজ প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।

সাজেকের প্রবেশমুখ রুইলুই পাড়ায় সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্মিত কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে হ্যারিজন গার্ডেন, ছায়াবীথি, রংধনু সেতু ও পাথরের বাগান পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। পাশাপাশি সেখানে বিশ্রামাগার ও ক্লাবঘরের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সাজেকের কাছেই হাউসপাড়ার ঝর্ণাও ভ্রমণকারীদের অন্যতম আকর্ষণ। পর্যটকদের সুবিধার্থে সেখানে ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সড়ক ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের ফলে এলাকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে সাজেকে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক কটেজ, কুটির ও রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে খাস্রাং রিসোর্ট, রুনময়, সাজেক রিসোর্ট, মেঘপুঞ্জি, ছাউনি ইকো কুঠির এবং লুসাই ভিলেজ উল্লেখযোগ্য। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সরকারি ছুটি ও দীর্ঘ অবকাশে আবাসনের ভাড়া বেড়ে গেলেও অন্যান্য সময়ে দর-কষাকষির সুযোগ থাকে।

সাজেককে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ির পরিবহন ও আবাসন খাতেও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। অনেক পর্যটক সাজেক ভ্রমণের আগে বা পরে খাগড়াছড়ি শহরে রাতযাপন করেন। জেলা সদর থেকে পিকআপ, চাঁদের গাড়ি ও সাফারি জিপ ভাড়া করে সহজেই সাজেকে যাওয়া যায়।
তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে সাজেকে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন রিসোর্ট, হোটেল ও পাকা ভবন নির্মাণের কারণে অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আগের মতো উপভোগ করা যাচ্ছে না। তাই পরিবেশ ও পাহাড়ের স্বাভাবিক সৌন্দর্য রক্ষায় সাজেকের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
খাগড়াছড়ি জেলা ট্যুরিস্ট পুলিশের উপপরিদর্শক নয়ন বড়ুয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে সাজেকে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এ সময় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসের ঝুঁকির কারণে সাজেকে ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে বর্ষাকালে পাহাড়ি সড়কে চলাচল ও অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।



