বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
বিবিধ

যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে শিশুরা, দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে: ইউনিসেফ

images (33)

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়া, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকটের কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে। আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে পারে শিশুরা।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। সংস্থাটির নতুন এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংকট গত কয়েক বছরে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পাশাপাশি লাখ লাখ শিশুকে আরও গভীর সংকটের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে বৈষম্য বাড়িয়ে দিতে পারে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইউনিসেফের ‘দ্য ইমপ্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মনিটারিলি পুওর হাউজহোল্ডস’ শীর্ষক বিশ্লেষণে বিশ্বের ১৬৭টির বেশি দেশের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং খাদ্য বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

ইউনিসেফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দরিদ্র পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে এসব পরিবারের শিশুরা শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

Advertisements

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু সংঘাতপূর্ণ এলাকার শিশুদের ওপর পড়ছে না, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুরাও এর মূল্য দিচ্ছে। তিনি বলেন, সংকট যত দীর্ঘ হবে, এর নেতিবাচক প্রভাব তত গভীর হবে। দ্রুত বাড়তে থাকা নিত্যপণ্যের দামের কারণে অনেক পরিবারের জন্য খাবার কেনা এবং শিশুদের শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, যারা আগে থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে, এই সংকট তাদের দুর্দশাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যতে থেকে যেতে পারে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। তুলনামূলক কম ক্ষতিকর পরিস্থিতিতে মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক চাপের কারণে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে এই সংখ্যা বেড়ে ২ কোটি ৩৪ লাখে পৌঁছাতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং শিশুদের দারিদ্র্যের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং অনেক দেশের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত থাকায় পরিবারগুলোর জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ইউনিসেফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে। বিশ্বজুড়ে শিশু দারিদ্র্য বৃদ্ধির যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই এই দুই অঞ্চলে ঘটতে পারে। কারণ এই অঞ্চলের অনেক দেশ আগে থেকেই উচ্চ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে এবং বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব এখানে বেশি অনুভূত হয়।

প্রতিবেদনে কয়েকটি দেশের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সোমালিয়ায় সংঘাতের কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানী মোগাদিশুতে জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যায়। এর ফলে খাদ্য, পানি, পরিবহন এবং মানবিক সহায়তার খরচ বেড়ে দেশটির অপুষ্টি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার প্রভাবে ইথিওপিয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। সেখানে ডিজেলের দাম ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচও ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নাইজেরিয়ার মতো দেশেও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও যাতায়াতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে দেশের পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বহু বছরের অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে লাখ লাখ শিশু আরও পিছিয়ে পড়বে এবং পরিবারগুলোর জন্য সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে যাবে।

সংস্থাটি বলছে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠবে।

এই পরিস্থিতিতে ইউনিসেফ বিশ্বের সরকার, দাতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শিশুদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষা কার্যক্রমে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, শিশুবান্ধব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সেবা ও পণ্য সহজলভ্য রাখা এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা।

ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, এই সংকট শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশ্ব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব লাখ লাখ শিশুকে গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে বহু বছরের উন্নয়ন অর্জনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Advertisements
ইউনিসেফদারিদ্র্যযুদ্ধশিশু