কেন হয় জরায়ুমুখ ক্যানসার, যে কারণে টিকা নেওয়া জরুরি

জরায়ুমুখ ক্যানসার একসময় বিশ্বজুড়ে নারীদের জন্য অন্যতম প্রাণঘাতী ক্যানসার হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতিতে এই চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ডে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসারে মৃত্যুর কোনো ঘটনা রেকর্ড হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এটিকে এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) টিকাদান কর্মসূচির বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
এই অর্জন শুধু একটি দেশের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বিশ্বব্যাপী জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে নতুন আশার বার্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে এখনো নারীদের মধ্যে এই ক্যানসার একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, সেখানে সচেতনতা ও টিকাদান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন হয় জরায়ুমুখ ক্যানসার?
জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রায় সব ক্ষেত্রেই দায়ী এইচপিভি বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস। বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৩ ধরনের এইচপিভি সংক্রমণ প্রায় ৯৯.৭ শতাংশ জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য দায়ী বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।
ভাইরাসটি দীর্ঘদিন শরীরে থেকে জরায়ুমুখের কোষে পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা চিকিৎসা না হলে ধীরে ধীরে ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। তবে সুখবর হলো, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরাপদ টিকা বহু বছর ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেন টিকা নেওয়া জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সের কিশোরীদের যৌনজীবন শুরু হওয়ার আগেই এইচপিভি টিকা দিলে ভবিষ্যতে জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই বয়সে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা টিকার প্রতি সবচেয়ে ভালো সাড়া দেয়। ১৫ বছরের আগে টিকা নিলে সাধারণত একটি ডোজই যথেষ্ট, ফলে খরচও কম হয় এবং সুরক্ষাও কার্যকর থাকে। শুধু জরায়ুমুখ ক্যানসার নয়, এই টিকা গলা, মুখ, ঘাড়ের কিছু ক্যানসার এবং জেনিটাল ওয়ারট প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের অগ্রগতি
বাংলাদেশ সরকারও কিশোরীদের জন্য এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) লক্ষ্য হলো- বিশ্বজুড়ে ১৫ বছরের আগেই অন্তত ৯০ শতাংশ কিশোরীকে এই টিকার আওতায় আনা এবং একই সঙ্গে নিয়মিত স্ক্রিনিং নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য অর্জন করা গেলে আগামী শতকের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসারকে প্রায় নির্মূল করা সম্ভব হতে পারে বলে সংস্থাটি আশা করছে।
কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
অনেক অভিভাবকের মধ্যেই এখনো এই টিকা নিয়ে অযথা ভয় বা ভুল ধারণা রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এইচপিভি টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। টিকা নেওয়ার পর ইনজেকশনের স্থানে হালকা ব্যথা, লালচে ভাব, সামান্য জ্বর বা শরীরব্যথার মতো স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত দ্রুত সেরে যায়। তবে কারও তীব্র অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে আগে চিকিৎসককে জানানো উচিত।
জরায়ুমুখ ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা সচেতনতা, সময়মতো টিকাদান এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই কুসংস্কার বা দ্বিধা নয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীদের সুস্থ জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।



