বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

বিশ্বের সবচেয়ে একাকী হাতি: মালির নিঃসঙ্গ জীবন

gettyimages-1365574822 (1)

একটি হাতি- যে প্রাণীটি প্রকৃতিতে পরিবারের সঙ্গে থাকে, শাবকদের ঘিরে রাখে, শোক প্রকাশ করে, আনন্দ ভাগ করে নেয় এবং সারা জীবন সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। সেই প্রাণীটিই যদি বছরের পর বছর একা একটি ছোট্ট ঘেরে বন্দি থাকে, তবে তার জীবন কেমন হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠেছিল মালি। ফিলিপাইনের ম্যানিলা চিড়িয়াখানার একটি এশীয় হাতি, যাকে সারা বিশ্ব চিনত “দ্য ওয়ার্ল্ডস লোনলিয়েস্ট এলিফ্যান্ট” নামে। মালির জন্ম ১৯৭৪ সালে শ্রীলঙ্কায়। মাত্র তিন বছর বয়সে তাকে ফিলিপাইনে পাঠানো হয় তৎকালীন ফার্স্ট লেডি ইমেলদা মার্কোসের জন্য একটি কূটনৈতিক উপহার হিসেবে। সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তার স্বাধীন জীবনের শেষ যাত্রা।

শুরুর দিকে মালির সঙ্গে আরেকটি হাতি ছিল। কিন্তু ১৯৮১ সালে তার সঙ্গী মারা যাওয়ার পর শুরু হয় দীর্ঘ একাকীত্ব। এরপর প্রায় চার দশক ধরে মালি কোনো হাতির সঙ্গ ছাড়াই একই চিড়িয়াখানায় বন্দি জীবন কাটিয়েছে।

হাতিরাও একা থাকতে পারে না

Advertisements

অনেকেই ভাবেন, প্রাণীরা একা থাকলেও তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু হাতির ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, হাতি পৃথিবীর অন্যতম সামাজিক প্রাণী। তারা দলবদ্ধভাবে বাস করে, একে অপরকে রক্ষা করে, মৃত সঙ্গীর জন্য শোক প্রকাশ করে এবং জটিল সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকলে হাতির মধ্যে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, অস্বাভাবিক আচরণ এবং শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। মালির ক্ষেত্রেও এমন লক্ষণ বহুবার দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা, শরীর দোলানো বা একই পথ বারবার হাঁটার মতো আচরণ বন্দিদশায় থাকা প্রাণীদের মানসিক কষ্টের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘ফ্রি মালি’ আন্দোলন

মালির জীবন একসময় আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। প্রাণী অধিকার সংগঠন, পরিবেশবাদী এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ “Free Mali” নামে প্রচারণা শুরু করেন। তাদের দাবি ছিল, মালিকে এমন কোনো অভয়ারণ্যে স্থানান্তর করা হোক, যেখানে অন্য হাতিদের সঙ্গে স্বাভাবিক পরিবেশে বাকি জীবন কাটাতে পারবে।

বিশ্বখ্যাত প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোও এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। হাজার হাজার মানুষ অনলাইনে আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মালির ছবি ছড়িয়ে পড়ে, আর সে হয়ে ওঠে বন্দি বন্যপ্রাণীদের প্রতীক।

কেন মুক্তি পেল না?

তবে ফিলিপাইনের কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল ভিন্ন। তাদের মতে, মালির বয়স অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ বিমানযাত্রা, নতুন পরিবেশ এবং নতুন হাতিদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই তাকে স্থানান্তর না করার সিদ্ধান্তই নিরাপদ।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক কখনো থামেনি। কেউ বলেছিলেন এটি ছিল নিরাপত্তার প্রশ্ন, আবার অনেকের মতে এটি ছিল একটি হারিয়ে যাওয়া সুযোগ।

শেষ পর্যন্ত…২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ৪৯ বছর বয়সে মারা যায় মালি। মৃত্যুর পর পরীক্ষায় জানা যায়, তার শরীরে ক্যানসারসহ একাধিক স্বাস্থ্যগত জটিলতা ছিল। মালির মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ শোক প্রকাশ করেন। অনেকের মতে, সে শুধু একটি হাতি ছিল না; বরং বন্দি প্রাণীদের অধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

মালির গল্প আমাদের কী শেখায়?

আজ পৃথিবীর বহু চিড়িয়াখানা আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। প্রাণীদের জন্য বড় ঘেরা জায়গা, সমৃদ্ধ পরিবেশ এবং সামাজিকভাবে থাকার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। তবুও মালির গল্প মনে করিয়ে দেয়, শুধু খাবার আর চিকিৎসাই একটি প্রাণীর সুখী জীবনের জন্য যথেষ্ট নয়।

বিশেষ করে হাতির মতো বুদ্ধিমান ও সামাজিক প্রাণীর জন্য স্বাধীনতা, সঙ্গ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।মালি হয়তো আর নেই। কিন্তু তার নিঃসঙ্গ জীবন বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে- মানুষের বিনোদনের জন্য কোনো প্রাণীকে কি তার স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করে রাখা নৈতিক? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে আরও মানবিক ও প্রাণীবান্ধব চিড়িয়াখানা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

Advertisements
একাকীজীবনদ্য ওয়ার্ল্ডস লোনলিয়েস্ট এলিফ্যান্টনিঃসঙ্গমালিহাতি