বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

খেলাধুলা বাধ্যতামূলক, মাঠ কোথায়? প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ

d7d63ac3dae829d8df1fe0d9394542ee-6953c4d219cb6

২০২৭ থেকে প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলক খেলাধুলা, কিন্তু প্রায় ১১ হাজার সরকারি স্কুলে নেই খেলার মাঠ। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলাকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৭ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি থেকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, কারণ দেশের প্রায় ১১ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতিও একই রকম উদ্বেগজনক- ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৯০টিতে মাঠ রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি এবং বেসরকারি বিদ্যালয় ৫৩ হাজার ৩৮টি। সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১০ হাজার ৭৪০টিতে খেলার জন্য কোনো মাঠ নেই।

শিক্ষাবিদদের মতে, খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা হলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়বে, মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত হবে এবং দলগত নেতৃত্ব ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়কেন্দ্রিক ক্রীড়া সংস্কৃতিও শক্তিশালী হবে।
এর আগে গত ১৫ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘শিশুর নিরাপদ জীবন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর খেলার মাঠের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটির দাবি, মাঠের অভাবে শিশুরা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে বেশি সময় কাটাচ্ছে, ফলে তারা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকিতেও তারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, শিশুদের ক্রীড়ামুখী করে তুলতেই জাতীয় পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা যুক্ত করা হচ্ছে এবং এটি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৪ জুন মিরপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন।

Advertisements

এদিকে গত ২৮ জুন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাঠের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করে। এর আগে ১৬ মার্চ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ডিপিইর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে মাঠ রয়েছে সেগুলোকে খেলাধুলার উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজের উদ্যোগ নিতে হবে। আর যেসব বিদ্যালয়ে মাঠ নেই, সেগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন অধিদপ্তরে পাঠাতে হবে।

নিজস্ব মাঠ না থাকলে আশপাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি মালিকানাধীন মাঠ, মন্দির-মসজিদের খোলা জায়গা, পতিত জমি কিংবা অন্য সরকারি সংস্থার মাঠ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যেসব বিদ্যালয়ে কোনোভাবেই মাঠের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে না, সেখানে দাবা, ক্যারামসহ বিভিন্ন ইনডোর গেমসের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং বিদ্যালয়ের মাঠ ছুটির পর শিশুদের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বলেন, ২০২৭ সাল থেকেই খেলাধুলা পাঠ্যক্রমে যুক্ত হবে। তবে শহরের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে মাঠ না থাকাকে তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরা হবে। যদিও ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ের মূল সংস্করণ ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে, তাই খেলাধুলা-সংক্রান্ত অংশ পরে সংযোজন করা হতে পারে।

অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। অধিদপ্তর বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে জাতীয় সংসদেও খেলার মাঠ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি দেশের মাঠ ও পার্ক দখলমুক্ত করে শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। জবাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জানান, মাঠ ও পার্ক পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকায়নে সরকার কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ৮ থেকে ১০ বিঘা আয়তনের একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে দখল হওয়া মাঠ পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। কমিটি ইতোমধ্যে কয়েকটি সভা করেছে এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠ পরিদর্শন করেছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- যেখানে হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো খেলার জন্য ন্যূনতম মাঠ নেই, সেখানে জাতীয় পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisements
খেলাধুলাচ্যালেঞ্জপ্রাথমিক শিক্ষা