বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

রান্নাঘরের নান্দনিকতা নাকি পুরোনো পিতৃতন্ত্রের নতুন মুখ?

WhatsApp Image 2026-07-16 at 3.01.13 PM

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও। ভোরের আলো ফুটতেই এক তরুণী খামার থেকে সদ্য সংগ্রহ করা ডিম নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকছেন। হাতে কাঠের বাটি, চুলায় ঘরে তৈরি রুটি, পাশে খেলছে সন্তান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভিডিওটি লাখো মানুষের টাইমলাইনে পৌঁছে যায়। ক্যাপশনে লেখা- “এই তো সত্যিকারের সুখের জীবন।”
এমন ভিডিও এখন আর বিরল নয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবে “Tradwife” বা “Traditional Wife” নামে পরিচিত একটি জীবনধারা দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। বাইরে থেকে এটি নিখুঁত পারিবারিক জীবনের ছবি মনে হলেও, এর ভেতরে রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস।

ট্র্যাডওয়াইফ আসলে কী?

‘ট্র্যাডওয়াইফ’ বলতে এমন একজন স্ত্রীকে বোঝানো হয়, যিনি পরিবারের দেখভাল, সন্তান লালন-পালন, রান্নাবান্না ও স্বামীর সেবাকেই নিজের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে কর্মজীবন ছেড়ে পুরো সময় গৃহস্থালির কাজেই নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।

তবে বিষয়টি কেবল গৃহিণী হওয়া নয়। বিতর্কের মূল জায়গা হলো- এই জীবনধারাকে কি নারীর জন্য “আদর্শ” হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে? কারণ পৃথিবীর কোটি কোটি নারী স্বেচ্ছায় বা প্রয়োজনের তাগিদে গৃহিণী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের কাজের মূল্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যখন বলা হয়, নারীর প্রকৃত ভূমিকা কেবল ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, তখনই প্রশ্ন ওঠে।

Advertisements

সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকারা

এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত মুখদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের ইনফ্লুয়েন্সার হান্নাহ নিলম্যান। ‘Ballerina Farm’ নামে পরিচিত তাঁর ভিডিওগুলোতে দেখা যায়- খামারে কাজ করা, নিজের হাতে রুটি বানানো, সন্তানদের নিয়ে প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন। লাখ লাখ মানুষ তাঁর ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হন। আবার সমালোচকেরা বলেন, এই জীবন বাস্তবে অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। কারণ এমন জীবনযাপনের পেছনে প্রয়োজন জমি, অর্থ, সময় এবং পারিবারিক সহায়তা- যা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে প্রায় অসম্ভব।

নান্দনিকতার আড়ালের অর্থনীতি

সোশ্যাল মিডিয়ায় যে জীবন দেখা যায়, সেটি প্রায়ই বাস্তব জীবনের সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়। অনেক জনপ্রিয় ট্র্যাডওয়াইফ ইনফ্লুয়েন্সারের রয়েছে বিপুল সম্পদ, পেশাদার ভিডিও টিম, ক্যামেরা, ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ এবং ব্যবসা।

অর্থাৎ তাঁরা কেবল ঘরের কাজ করছেন না; সেই জীবনধারাকেই একটি সফল ব্যবসায় পরিণত করেছেন।
কিন্তু সাধারণ একজন নারী, যিনি প্রতিদিন রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান সামলানো এবং সংসারের সব দায়িত্ব পালন করেন- তাঁর কাজের কোনো বেতন নেই, সামাজিক স্বীকৃতিও খুব সীমিত।

ইতিহাস বলছে অন্য কথা

ট্র্যাডওয়াইফ ধারণার শিকড় নতুন নয়। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীদের জন্য প্রকাশিত হতো নানা ধরনের “Conduct Literature”। এসব বই ও লেখায় শেখানো হতো- একজন ভালো স্ত্রী কেমন হবেন।

সেখানে নারীর আদর্শ পরিচয় ছিল:
-বিনয়ী
-অনুগত
-স্বামীনির্ভর
-সংসারকেন্দ্রিক
-আত্মত্যাগী

একই সময়ে “Coverture” নামে প্রচলিত আইনের কারণে বিবাহিত নারীর আলাদা আইনি পরিচয় প্রায় থাকত না। সম্পত্তি, আয়, এমনকি অনেক ব্যক্তিগত অধিকারও স্বামীর নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। অর্থাৎ আদর্শ গৃহবধূর ধারণা কেবল সাংস্কৃতিক ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতারও একটি কাঠামো।

তাহলে কি গৃহিণী হওয়া ভুল?

একেবারেই নয়। আধুনিক নারীবাদ বরং বলে- নারীর স্বাধীনতা মানে নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় কর্মজীবন ছেড়ে পরিবারকে সময় দেন, সেটিও তাঁর অধিকার।
আবার কেউ যদি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষক, শিক্ষক কিংবা উদ্যোক্তা হতে চান, সেটিও সমানভাবে তাঁর অধিকার। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন একটি জীবনধারাকেই “একমাত্র আদর্শ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়।

কেন এই প্রবণতা আবার জনপ্রিয়?

বিশ্লেষকদের মতে কয়েকটি কারণ রয়েছে। কর্পোরেট জীবনের অতিরিক্ত চাপ, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, মানসিক ক্লান্তি এবং দ্রুতগতির জীবনে অনেকেই ধীর, শান্ত, পারিবারিক জীবনকে আকর্ষণীয় মনে করছেন। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, নান্দনিক ভিডিওকে বেশি ছড়িয়ে দেয়। ফলে বাস্তবের কঠোর শ্রম, ক্লান্তি কিংবা মানসিক চাপ আড়ালে থেকে যায়।

রাজনৈতিক বিতর্ক কোথায়?

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু রক্ষণশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠী ঐতিহ্যগত পারিবারিক ভূমিকার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। তাদের একটি অংশ মনে করে, নারীরা ঘরে ফিরলে পরিবার শক্তিশালী হবে এবং সামাজিক মূল্যবোধ ফিরে আসবে। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এই প্রচারণা নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করতে পারে এবং দীর্ঘদিনের সমঅধিকারের আন্দোলনকে পিছিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যু বা পারিবারিক সহিংসতার মতো পরিস্থিতিতে আর্থিকভাবে নির্ভরশীল নারীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন।

বাংলাদেশে এই বিতর্ক কতটা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই “আদর্শ স্ত্রী”, “সংসারই নারীর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র” কিংবা “ক্যারিয়ারের চেয়ে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ”- এ ধরনের আলোচনা দেখা যায়।একই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ নারী প্রতিদিন সংসারের পাশাপাশি চাকরি, ব্যবসা কিংবা কৃষিকাজও করছেন। তাই বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। একজন গৃহিণীর শ্রম যেমন সম্মান পাওয়ার যোগ্য, তেমনি কর্মজীবী নারীর সিদ্ধান্তও সমানভাবে সম্মানের দাবি রাখে।

ট্র্যাডওয়াইফ হওয়া নিজে কোনো অপরাধ নয়। আবার কর্মজীবী হওয়াও কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।
মূল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়- এই জীবন কি নারীর নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত, নাকি সামাজিক চাপ, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ফল?

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিখুঁত রান্নাঘর, হাসিখুশি পরিবার আর দাগহীন সংসার দেখানো সহজ। কিন্তু বাস্তব জীবনের সুখ কেবল সুন্দর ভিডিও দিয়ে মাপা যায় না। নারীর স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তিনি নিজের জীবন নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার সুযোগ পান- সে সিদ্ধান্ত তাঁকে ঘরের ভেতরে রাখুক বা পৃথিবীর যেকোনো কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যাক।

আরো একটি প্রশ্ন হলো – যে জীবনকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘স্বপ্নের সংসার’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, সেটি কি সত্যিই সবার জন্য সম্ভব? নাকি নিখুঁত ভিডিও, দামী ক্যামেরা আর বিলাসী জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক আদর্শ, যা বাস্তবের অধিকাংশ নারীর জীবন থেকে বহু দূরে?

ট্র্যাডওয়াইফ আন্দোলনকে বোঝার জন্য শুধু রান্নাঘরের দিকে তাকালেই হবে না। তাকাতে হবে ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্কের দিকেও। কারণ এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু একজন গৃহিণী নন-আছে নারীর স্বাধীনতা, পছন্দের অধিকার এবং সমাজ তাকে কীভাবে দেখতে চায়, সেই পুরোনো প্রশ্নও।

Advertisements
অর্থনীতিট্র্যাডওয়াইফপিতৃতন্ত্রবিতর্করাজনৈতিক বিতর্করান্নাঘরসোশ্যাল মিডিয়া