বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
জীবনযাপন

প্রতি রাতে মাত্র সাত ঘণ্টা ঘুমায় দেশটির মানুষ!

WhatsApp Image 2026-07-16 at 2.19.25 PM

জাপানকে আমরা চিনি প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা আর কর্মনিষ্ঠার দেশ হিসেবে। বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতি গড়ে তোলা এই দেশটির মানুষের পরিশ্রমের গল্প বহুদিন ধরেই অনুপ্রেরণা হিসেবে বলা হয়। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব সংকট- ঘুমের অভাব।

গবেষণা বলছে, জাপানের একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতি রাতে গড়ে মাত্র ৭ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ঘুমান। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে কম ঘুমের হারগুলোর একটি। একই অবস্থায় রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াও। অন্যদিকে ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস বা ইউরোপের কয়েকটি দেশের মানুষ গড়ে সাড়ে আট ঘণ্টার কাছাকাছি ঘুমান।

তবে জাপানের এই ঘুমহীনতার পেছনে শুধু ব্যস্ত জীবন নয়, রয়েছে একটি গভীর সামাজিক সংস্কৃতি।

যেখানে ঘুমও পরিশ্রমের প্রমাণ

Advertisements

জাপানি সমাজে বহুল পরিচিত একটি শব্দ হলো ‘ইনেমুরি’ (Inemuri)। এর অর্থ, দায়িত্বে উপস্থিত থেকেই একটু ঘুমিয়ে নেওয়া। অফিসের মিটিং, ট্রেন বা বাসে বসে কেউ যদি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন, সেটিকে সেখানে অলসতা হিসেবে দেখা হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি বোঝায় যে ব্যক্তি এতটাই কঠোর পরিশ্রম করেছেন যে শরীর আর জেগে থাকতে পারেনি।

একসময় ক্লান্তি যেন ছিল পরিশ্রমের পদক। দীর্ঘ সময় অফিসে থাকা, অতিরিক্ত কাজ করা কিংবা নিজের বিশ্রামকে ত্যাগ করা- এসবই ছিল একজন নিবেদিত কর্মীর পরিচয়।

সাফল্যের মূল্য কতটা?

জাপানে অনেক কর্মীকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত। ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার কিংবা বিশ্রামের জন্য সময় ক্রমেই কমে আসে। ফলে পর্যাপ্ত ঘুম অনেকের কাছেই বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু এই সংস্কৃতির মূল্যও কম নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের অভাবের কারণে মনোযোগ কমে যায়, ভুল বাড়ে, মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশাল। প্রতি বছর কেবল ঘুমের ঘাটতির কারণেই জাপানের অর্থনীতিতে প্রায় ১৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়।

এবার বদলাচ্ছে জাপান

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জাপান সরকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। কর্মীদের অতিরিক্ত কাজ কমানো, ওভারটাইম নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমানোর জন্য পুরস্কারও দিচ্ছে। কারণ তারা বুঝেছে, একজন ভালো কর্মী হতে হলে শুধু কঠোর পরিশ্রম করলেই হবে না, প্রয়োজন সুস্থ শরীর ও সতেজ মনও।

ঘুম কোনো অলসতা নয়

একসময় যে দেশটি মনে করত কম ঘুম মানেই বেশি সাফল্য, সেই জাপানই আজ নতুন বার্তা দিচ্ছে- পর্যাপ্ত ঘুমও কর্মদক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক জীবনের প্রতিযোগিতায় আমরা অনেকেই ঘুমকে অপ্রয়োজনীয় মনে করি। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক স্মৃতি গুছিয়ে নেয়, শরীর নিজেকে মেরামত করে এবং পরের দিনের জন্য শক্তি সঞ্চয় করে।

হয়তো তাই জাপানের এই পরিবর্তন আমাদের জন্যও একটি শিক্ষা। সাফল্যের পেছনে ছোটা জরুরি, কিন্তু সেই দৌড়ে যদি ঘুম হারিয়ে যায়, তবে একসময় সাফল্যও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কারণ দিনের কর্মক্ষমতা শুরু হয় আগের রাতের ভালো ঘুম থেকেই।

Advertisements
ঘুমজাপানপরিশ্রমসাফল্য