গবলিনটিমেসি! ডেটিংয়ের নতুন ট্রেন্ডে মজেছে জেন-জি

করোনা-পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে ‘বার্নআউট’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও, ডেটিংয়ে বারবার ব্যর্থতা থেকে তৈরি হওয়া মানসিক ক্লান্তি নিয়ে তেমন কথা হয়নি। বিশেষ করে ডেটিং অ্যাপে একের পর এক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, প্রত্যাশা, হতাশা এবং সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারার অভিজ্ঞতা অনেকের মধ্যেই এক ধরনের ‘ডেটিং বার্নআউট’ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নতুন একটি ধারণা- ‘গবলিনটিমেসি’।
সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ডেটে নিজেকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করার সামাজিক চাপই অনেক সময় মানসিক ক্লান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুন্দর পোশাক, নিখুঁত সাজ, নিজের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখা কিংবা সব সময় ‘পারফেক্ট’ দেখানোর চেষ্টা সম্পর্কের শুরুটাকেই কৃত্রিম করে তোলে।

এই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গড়ে উঠেছে ‘গবলিনটিমেসি’। এর মূল কথা হলো, সম্পর্কের শুরু থেকেই নিজের বাস্তব পরিচয় তুলে ধরা। নিজের ভালো-মন্দ, সীমাবদ্ধতা, অদ্ভুত অভ্যাস কিংবা অপূর্ণতাকে লুকিয়ে না রেখে সৎভাবে প্রকাশ করাই এই ট্রেন্ডের মূল দর্শন। ‘গবলিনটিমেসি’ শব্দটির উৎপত্তি ‘গবলিন মোড’ থেকে। ২০২২ সালে ‘গবলিন মোড’ অক্সফোর্ড ওয়ার্ড অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়। এটি এমন এক মানসিক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে মানুষ সামাজিক প্রত্যাশা বা সব সময় নিখুঁত হওয়ার চাপকে উপেক্ষা করে নিজের স্বাভাবিক ও অসম্পূর্ণ সত্তাকে গ্রহণ করে।
অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক ও প্রেম–বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. লারভে বলেন, গবলিনটিমেসি মানুষকে নিজের ভালো, খারাপ এবং অসম্পূর্ণ দিকগুলো মেনে নিতে শেখায়। যারা সম্পর্কের শুরুতেই ভান না করে নিজের মতো থাকতে চান, তাঁদের জন্য এটি ইতিবাচক একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহারের মতে, প্রথম সাক্ষাতেই কতটা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা হবে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। নিজের পরিচয়, পড়াশোনা, পরিবার বা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সৎ থাকা ভালো হলেও, অতীত সম্পর্কের বিস্তারিত স্মৃতি বা এমন তথ্য যা অন্য পক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, তা শুরুতেই না বলাই ভালো।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, গবলিনটিমেসি মানে উদাসীন বা দায়িত্বহীন আচরণ নয়। সম্পর্কে আগ্রহ, সম্মান ও যত্ন দেখানো সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বরং এই ধারণা শেখায়, একটি সফল ডেট মানেই নিখুঁত অভিনয় নয়; বরং স্বচ্ছতা, আন্তরিকতা এবং বাস্তবতাই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। তিনি জানান, তাঁর এক বন্ধু প্রথমবার দেখা করতে যাওয়ার আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নিজের অতীত, পরিবার এবং ব্যক্তিগত কিছু বিষয় শুরু থেকেই সৎভাবে জানাবেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মিথ্যার আশ্রয় নিতে না হয়। তাঁর মতে, সম্পর্কের শুরুতেই সত্যবাদী হওয়া পরবর্তীতে বিশ্বাসের ভিত্তি আরও শক্ত করে।
ডেটিংয়ের পরিবর্তিত এই ধারা দেখাচ্ছে, নতুন প্রজন্ম আর নিখুঁত হওয়ার অভিনয়ে বিশ্বাসী নয়। বরং তারা মনে করে, সম্পর্কের শুরু থেকেই নিজের প্রকৃত সত্তা তুলে ধরাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর ও স্বাস্থ্যকর পথ।



