ভারতের রহস্যময় ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ গ্রাম!

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অসম রাজ্যের মরিগাঁও জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম—মায়ং। গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এই জনপদকে দীর্ঘদিন ধরেই অনেকে “ভারতের ব্ল্যাক ম্যাজিকের রাজধানী” নামে চেনে। তবে এই পরিচয়ের পেছনে যতটা রহস্যের গল্প রয়েছে, তার সবটাই যে প্রমাণিত ইতিহাস নয়, সে কথাও মনে রাখা জরুরি। ইতিহাস, তন্ত্রসাধনা, লোকবিশ্বাস, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, ভেষজ চিকিৎসা ও জনশ্রুতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মায়ংয়ের অনন্য পরিচয়।- মায়ং নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে ভিন্নমত। একদল গবেষকের মতে, সংস্কৃত শব্দ ‘মায়া’ থেকে এসেছে ‘মায়ং’ নামটি। আবার অন্যদের ধারণা, একসময় এই অঞ্চলে বসবাসকারী মাইবং বা মিয়ং সম্প্রদায়ের নাম থেকেই এর নামকরণ হয়েছে। কামরূপ অঞ্চলে তন্ত্রসাধনার ইতিহাসের সঙ্গে মায়ংয়ের নাম বহুবার উঠে এলেও ইতিহাসবিদরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তন্ত্রচর্চার অস্তিত্ব আর অলৌকিক শক্তির দাবিকে এক করে দেখা ঠিক নয়।

মায়ংকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত গল্প তন্ত্রসাধনা ও মন্ত্রচর্চাকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় লোককথায় বলা হয়, একসময় এখানে এমন সাধক ছিলেন যারা বিশেষ মন্ত্রের মাধ্যমে মানুষকে পশুতে রূপান্তরিত করতে, অদৃশ্য হয়ে যেতে কিংবা শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পারতেন। হারিয়ে যাওয়া বস্তু খুঁজে বের করার মতো নানা অলৌকিক ঘটনার কাহিনিও আজও গ্রামের প্রবীণদের মুখে শোনা যায়। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, এগুলো মূলত শতাব্দীপ্রাচীন লোকবিশ্বাস ও কিংবদন্তির অংশ।
রহস্যের পাশাপাশি মায়ংয়ের আরেকটি বড় পরিচয় তার প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। সাঁচিপাত ও তালপাতায় লেখা বহু শতাব্দী পুরোনো পুঁথিতে সংরক্ষিত রয়েছে তন্ত্রসাধনা, ভেষজ চিকিৎসা, মন্ত্র, আচার এবং তৎকালীন সমাজজীবনের নানা তথ্য। এসব পাণ্ডুলিপিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকজ জ্ঞান ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মায়ং সেন্ট্রাল মিউজিয়াম অ্যান্ড এম্পোরিয়ামে আজও সংরক্ষিত রয়েছে এসব দুর্লভ পুঁথি, প্রাচীন মূর্তি, ধাতব সামগ্রী ও বিভিন্ন প্রত্নবস্তু।
এই অঞ্চলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য হলো লোকজ ভেষজ চিকিৎসা। স্থানীয়ভাবে ‘বেজ’ বা ‘ওজা’ নামে পরিচিত চিকিৎসকেরা বহু প্রজন্ম ধরে বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন গাছগাছড়া ব্যবহার করে চিকিৎসা করে আসছেন। স্থানীয় মানুষের কাছে এই পদ্ধতির প্রতি আস্থা থাকলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এসব চিকিৎসার সব দাবিকে সমর্থন করে না। ফলে এটিকে মূলত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই দেখা হয়।
মায়ংয়ের আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রত্ননিদর্শনও। বুরহা মায়ং এলাকায় আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাচীন শিলালিপি এবং গণেশ, শিব ও পার্বতীর ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন। এসব আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয়, বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই অঞ্চল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এছাড়া ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ চরভূমি এবং পোবিতোরা অভয়ারণ্যের নিকটবর্তী হওয়ায় প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছেও মায়ং সমান আকর্ষণীয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মায়ংয়ের পরিচয়ে এসেছে নতুন মাত্রা। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা চান, তাঁদের গ্রামকে শুধুমাত্র ‘ব্ল্যাক ম্যাজিকের গ্রাম’ হিসেবে নয়; বরং প্রাচীন সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য, প্রত্নতত্ত্ব, পাণ্ডুলিপি ও ভেষজ জ্ঞানের সমৃদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হোক। তাই পর্যটকদের জন্য এখন গুরুত্ব পাচ্ছে মায়ংয়ের জাদুঘর, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন দিক।
তবুও রহস্যের আবরণ পুরোপুরি সরেনি। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও কিংবদন্তির মিশেলে গড়ে ওঠা মায়ং আজও ভারতের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা জনপদ। তবে এই গ্রামকে ঘিরে প্রচলিত অলৌকিক কাহিনির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই- এ বিষয়টি মাথায় রেখেই মায়ংকে ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকেরা।



