বিয়ে দেরি হচ্ছে? জেনে নিন কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত আমল

একসময় আমাদের সমাজে নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছালেই বিয়ে হয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক বিষয়। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার গড়া, আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক তরুণ-তরুণীর বিয়ে আগের তুলনায় অনেক দেরিতে হচ্ছে।
এ কারণে অনেকেই উপযুক্ত জীবনসঙ্গী না পাওয়া, বিয়ের প্রস্তাব বারবার ভেঙে যাওয়া কিংবা অনিশ্চয়তার কারণে মানসিক চাপে ভোগেন। একই সঙ্গে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন অভিভাবকেরাও। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে আল্লাহর সাহায্য কামনায় বিভিন্ন দোয়া ও আমলের আশ্রয় নেন। তবে কোন আমল সুন্নাহসম্মত এবং কোনটি কেবল প্রচলিত রীতি—তা জানা জরুরি।

বিলম্বকে ব্যর্থতা মনে নয়
ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো কল্যাণ দেরিতে আসা মানেই তা অকল্যাণ নয়। অনেক সময় মানুষের কাছে যা বিলম্ব মনে হয়, আল্লাহর পরিকল্পনায় সেটিই হতে পারে সর্বোত্তম সময়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘তোমরা যা অপছন্দ করো, সম্ভবত তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর তোমরা যা পছন্দ করো, সম্ভবত তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।‘
(সুরা আল-বাকারা: ২১৬)
তাই বিয়েতে বিলম্বকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে ধৈর্য ধারণ করা, বৈধ উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর ভরসা রাখাই একজন মুমিনের করণীয়।

নবী মুসা (আ.)-এর দোয়া
সংকটের সময়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার অন্যতম সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় নবী মুসা (আ.)-এর জীবনে। ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বেরিয়ে তিনি যখন মাদয়ানে পৌঁছান, তখন তিনি ছিলেন একা, আশ্রয়হীন ও সম্পদহীন। কুয়ার পাশে দুই নারীকে সাহায্য করার পর তিনি আল্লাহর কাছে একটি হৃদয়স্পর্শী দোয়া করেন, যা কোরআনে সংরক্ষিত রয়েছে।
দোয়া:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
উচ্চারণ: রব্বি ইন্নি লিমা আনযালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির।
অর্থ: ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী।‘
(সুরা আল-কাসাস: ২৪)
তাফসিরে ইবনে কাসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, এ দোয়া করার সময় মুসা (আ.) শুধু খাবারের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাকে শুধু খাদ্যই দেননি; নিরাপদ আশ্রয়, সম্মানজনক কাজ, উত্তম স্ত্রী এবং পরবর্তীতে নবুয়তের মতো মহান নিয়ামতও দান করেছিলেন।
এ কারণে আলেমরা বলেন, জীবনসঙ্গী ও কল্যাণ কামনায় এ দোয়াটি নিয়মিত পড়া উত্তম।
সংখ্যাভিত্তিক ‘অজিফা’ সম্পর্কে সতর্কতা
বিয়ে দ্রুত হওয়ার উদ্দেশ্যে সমাজে বিভিন্ন ধরনের সংখ্যাভিত্তিক আমল বা ‘অজিফা’ প্রচলিত রয়েছে। যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক বার সুরা ইয়াসিন পড়া, নির্দিষ্ট সংখ্যায় আল্লাহর নাম জপ করা বা বিশেষ আয়াত নির্দিষ্ট সংখ্যায় পাঠ করা।
ইসলামি স্কলাররা বলেন, কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির অবশ্যই নেক আমল। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে জিকির বা দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করেননি, সেটিকে ধর্মের বাধ্যতামূলক আমল মনে করা ঠিক নয়।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি উল্লেখ করেছেন, এ ধরনের অনেক আমল পরবর্তী যুগের কিছু আলেম বা বুযুর্গের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রচলিত হয়েছে; এগুলোর পক্ষে রাসুল (সা.) বা সাহাবিদের সুস্পষ্ট আমল পাওয়া যায় না।
তাই সুরা ইয়াসিন, সুরা মারইয়াম কিংবা সুরা মুজ্জাম্মিল তিলাওয়াত অবশ্যই সওয়াবের কাজ। তবে এগুলোকে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ নিয়মের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত না করে আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘তোমরা আল্লাহর কাছে এমনভাবে দোয়া করো যেন তোমরা নিশ্চিত যে তিনি তা কবুল করবেন। জেনে রেখো, আল্লাহ উদাসীন অন্তরের দোয়া কবুল করেন না।‘
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯)

যে তিন আমলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলেমরা
আলেমদের মতে, বিয়ে সহজ হওয়ার জন্য সুন্নাহসম্মত কয়েকটি আমল নিয়মিত করা যেতে পারে।
১. বেশি বেশি ইস্তিগফার
ক্ষমা প্রার্থনা শুধু গুনাহ মাফের মাধ্যম নয়, বরং এটি রিজিক ও কল্যাণ বৃদ্ধিরও একটি উপায়।
সুরা নুহে আল্লাহ তাআলা ইস্তিগফারের বিনিময়ে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধির সুসংবাদ দিয়েছেন।
ইমাম কুরতুবি উল্লেখ করেছেন, এক ব্যক্তি দারিদ্র্য ও বিয়ে না হওয়ার অভিযোগ নিয়ে হাসান বসরি (রহ.)-এর কাছে গেলে তিনি তাকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার পরামর্শ দেন।
২. তাহাজ্জুদ ও শেষ রাতের দোয়া
হাদিসে এসেছে, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে নেমে এসে ঘোষণা করেন—
“কে আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?”
(সহিহ মুসলিম: ৭৫৭)
তাই শেষ রাতে আন্তরিকভাবে দোয়া করা দোয়া কবুলের অন্যতম উত্তম সময়।
৩. কোরআনের দোয়া
আদর্শ পরিবার ও নেক জীবনসঙ্গী কামনায় কোরআনের অন্যতম সুন্দর দোয়া হলো—
‘রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিন ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।‘
(সুরা আল-ফুরকান: ৭৪)
এই দোয়া নিয়মিত পড়া পরিবার ও দাম্পত্য জীবনের কল্যাণ কামনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিভাবকদের জন্যও রয়েছে আমল
সন্তানের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা বাবা-মায়ের জন্যও ইসলাম সহজ একটি আমল শিখিয়েছে।
ফাতিমা (রা.) যখন গৃহকর্মের কষ্টের কথা জানিয়ে একজন সাহায্যকারী চেয়েছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ঘুমানোর আগে ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ পড়ার পরামর্শ দেন। এটি তাসবিহে ফাতেমি নামে পরিচিত।
(সহিহ বুখারি: ৫৩৬১)
এ ছাড়া সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের আন্তরিক দোয়ার গুরুত্বও ইসলামে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘তিন ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়—মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া।‘
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮৬২)
বিয়ে নির্ধারিত হয় আল্লাহর ইচ্ছা ও সময় অনুযায়ী। তাই বিলম্ব নিয়ে হতাশ না হয়ে বৈধ উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, তাহাজ্জুদ আদায় করা, কোরআনের দোয়া পড়া এবং সর্বোপরি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখাই একজন মুমিনের জন্য উত্তম পথ।



