বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত: স্বেচ্ছামৃ’ত্যু কি করুণার শেষ স্পর্শ, নাকি নৈতিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা?

sarco-risingbd-2112071701

মৃত্যু- শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভয়, শোক আর বিচ্ছেদের অনুভূতি জেগে ওঠে। কিন্তু এমনও কিছু মানুষ আছেন, যাদের কাছে মৃত্যু ভয়ের নয়, বরং দীর্ঘদিনের অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আরেক নাম। প্রশ্ন হলো, যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান জানিয়ে দেয় যে আর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন একজন মানুষের কি নিজের মৃত্যুর সময় ও পদ্ধতি বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বিশ্বজুড়ে জন্ম নিয়েছে সবচেয়ে বিতর্কিত চিকিৎসা-নৈতিক বিষয়গুলোর একটি- স্বেচ্ছামৃত্যু (Euthanasia)।

স্বেচ্ছামৃত্যু আসলে কী?

স্বেচ্ছামৃত্যু বলতে সাধারণত এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে নিরাময়-অযোগ্য রোগে আক্রান্ত এবং অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণায় থাকা একজন রোগীর জীবন কঠোর আইনি ও চিকিৎসাগত শর্ত পূরণ করে ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ করা হয়, যাতে তাঁর কষ্টের অবসান ঘটে।

এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি ধারণা হলো চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যু (Physician-assisted dying বা physician-assisted suicide)। এখানে চিকিৎসক রোগীকে প্রাণঘাতী ওষুধের ব্যবস্থা করে দেন, কিন্তু ওষুধটি গ্রহণ করেন রোগী নিজেই। অনেক দেশে এই দুটি বিষয়কে আইনগতভাবে আলাদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Advertisements

আত্মহত্যার সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?

অনেকেই মনে করেন স্বেচ্ছামৃত্যু মানেই আত্মহত্যা। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। আত্মহত্যা সাধারণত মানসিক সংকট, বিষণ্নতা, পারিবারিক বা সামাজিক চাপ, আর্থিক সমস্যা কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত কারণে ঘটে। অন্যদিকে স্বেচ্ছামৃত্যু আলোচনায় আসে তখন, যখন রোগীর অসুস্থতা আর নিরাময়যোগ্য নয় এবং চিকিৎসা কেবল কষ্ট দীর্ঘায়িত করছে। এই পার্থক্য বোঝা জরুরি, কারণ মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে থাকা ব্যক্তির আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা চিকিৎসা ও সমাজের অন্যতম দায়িত্ব। আর স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে বিতর্ক মূলত মরণাপন্ন রোগীদের জীবনাবসানের সিদ্ধান্তকে ঘিরে।


যে নারীদের গল্প বিশ্বকে ভাবিয়েছে

ব্রিটানি মেইনার্ড

২০১৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে মস্তিষ্কের আক্রমণাত্মক ক্যানসারে আক্রান্ত হন মার্কিন তরুণী ব্রিটানি মেইনার্ড। তিনি এমন একটি অঙ্গরাজ্যে চলে যান, যেখানে চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুর সুযোগ ছিল। নিজের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে তিনি বিশ্বজুড়ে “মৃত্যুর অধিকার” নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন। তাঁর ভিডিও ও লেখা লাখো মানুষকে এই বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

মারিয়েকে ভারভুর্ট

বেলজিয়ামের প্যারালিম্পিক স্বর্ণজয়ী মারিয়েকে ভারভুর্ট বহু বছর ধরে একটি দুরারোগ্য স্নায়বিক রোগে ভুগছিলেন। অসহনীয় ব্যথা, ঘুমহীনতা এবং শারীরিক অবনতির মধ্যে তিনি শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে বেলজিয়ামের আইনের আওতায় স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

নোয়া পোথোভেন: একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা

নেদারল্যান্ডসের কিশোরী লেখক নোয়া পোথোভেনকে নিয়ে বহু বছর ধরে ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছে যে তিনি আইনি স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়েছিলেন। বাস্তবে তা সঠিক নয়। তিনি আইনগত euthanasia পাননি। তাঁর মৃত্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে ভুল তথ্য কত সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কোন কোন দেশে বৈধ?

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ নয়। তবে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, কানাডা, স্পেন, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নির্দিষ্ট শর্তে স্বেচ্ছামৃত্যু বা চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুর ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুর অনুমতি থাকলেও সক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ নয়।

কেন সমর্থন করেন অনেকে?

সমর্থকদের মতে- মানুষের মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার যেমন অধিকার আছে, তেমনি মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার অধিকারও থাকা উচিত।অসহনীয় যন্ত্রণা যখন আর কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়, তখন রোগীর ইচ্ছাকে সম্মান করা মানবিক।রোগীর নিজের শরীর ও জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত।

কেন বিরোধিতা করেন অনেকে?

বিরোধীদের যুক্তিও কম শক্তিশালী নয়। তাঁদের মতে- চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব জীবন রক্ষা করা, জীবন শেষ করা নয়। অনেক রোগী মানসিক হতাশার কারণে মৃত্যুর কথা ভাবতে পারেন, কিন্তু যথাযথ মানসিক ও উপশমমূলক চিকিৎসা পেলে তাঁদের সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে। ভবিষ্যতে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী বা আর্থিকভাবে অসহায় মানুষ পারিবারিক বা সামাজিক চাপে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারেন।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বেচ্ছামৃত্যুর বিতর্কের পাশাপাশি প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমমূলক চিকিৎসার ওপর আরও জোর দেওয়া দরকার। এই চিকিৎসার লক্ষ্য রোগ সারানো নয়; বরং ব্যথা কমানো, মানসিক সহায়তা দেওয়া এবং রোগীর জীবনের শেষ সময়টুকু যতটা সম্ভব স্বস্তিদায়ক করে তোলা।

স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে বিতর্কের কোনো সহজ উত্তর নেই। এটি কেবল আইন বা চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি মানবতা, স্বাধীনতা, ধর্ম, নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন। একজন মরণাপন্ন রোগীর কাছে মৃত্যু হয়তো মুক্তি। আবার আরেকজনের কাছে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বেঁচে থাকার চেষ্টা- সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় জয়। এই দুই বিশ্বাসের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে স্বেচ্ছামৃত্যুর বিতর্ক, যার চূড়ান্ত উত্তর হয়তো আজও মানুষের কাছে অমীমাংসিত

Advertisements
আত্মহত্যামানসিক সংকটসিদ্ধান্তস্বেচ্ছামৃ'ত্যু