৩৫-এর পর মাতৃত্ব: বয়স নয়, প্রস্তুতিই হোক সবচেয়ে বড় শক্তি

একসময় সমাজে একটি ধারণা ছিল- ৩০ পেরিয়ে গেলেই মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, আর ৩৫-এর পর গর্ভধারণ মানেই ঝুঁকি। কিন্তু সময় বদলেছে। নারীদের শিক্ষা, কর্মজীবন, আর্থিক স্বাবলম্বিতা এবং নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বেড়েছে। ফলে অনেক নারীই এখন ত্রিশের শেষভাগ বা চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে মাতৃত্বকে বেছে নিচ্ছেন।
সম্প্রতি হলিউড অভিনেত্রী অ্যান হ্যাথাওয়ের ৪৩ বছর বয়সে তৃতীয় সন্তানের প্রত্যাশার খবর আবারও এই আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে- ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণ কি সত্যিই এতটা ঝুঁকিপূর্ণ, নাকি বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনেক ভুল ধারণা রয়েছে?
বয়স বাড়লে কী বদলায়?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, ৩৫ বছরের পর প্রথমবার গর্ভধারণকে তুলনামূলকভাবে উচ্চঝুঁকির মধ্যে ধরা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে মা বা শিশুর জন্য সমস্যা হবেই। বরং এটি বোঝায়, এই সময়ে আরও বেশি সতর্কতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
নারীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে থাকে। ফলে গর্ভধারণে সময় লাগতে পারে, গর্ভপাতের ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে এবং কিছু জটিলতার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে?
৩৫ বছরের পর গর্ভধারণে যেসব জটিলতার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-
-গর্ভপাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি
-গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
-উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়া
-সময়ের আগেই সন্তান জন্ম
-সিজারিয়ান অপারেশনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি
-শিশুর কিছু জেনেটিক সমস্যার ঝুঁকি কিছুটা বেশি হওয়া
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো সম্ভাবনা মাত্র। সব মায়ের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা দেখা দেয় না।
সুসংবাদও আছে
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, উন্নত প্রসূতি সেবা এবং নিয়মিত অ্যান্টেনাটাল কেয়ারের কারণে আজ অনেক নারী ৩৫ কিংবা ৪০ বছরের পরেও সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। যদি গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং পুরো গর্ভকাল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা হয়, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপদ মাতৃত্ব সম্ভব।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে একসময় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্ব। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিত্র বদলাচ্ছে। উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ক্যারিয়ার গঠন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার কারণে অনেক নারী এখন সচেতনভাবে দেরিতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের শিক্ষিত নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।
ভয় নয়, সচেতনতা
৩৫ বছরের পর গর্ভধারণকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে এটিকে হালকাভাবেও নেওয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন-
-গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো
-ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করা
-ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
-ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণে আনা
-ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
-নিয়মিত প্রসূতি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া
মাতৃত্ব কোনো প্রতিযোগিতা নয়
কেউ ২৫ বছরে মা হন, কেউ ৩৮ বছরে, আবার কেউ মাতৃত্বকে জীবনের অংশই করেন না। প্রতিটি সিদ্ধান্তই ব্যক্তিগত। সমাজের উচিত বয়স নিয়ে ভয় বা সমালোচনা না করে নারীদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা। একজন নারীর বয়স নয়, বরং তার শারীরিক প্রস্তুতি, মানসিক সুস্থতা, চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ এবং পারিবারিক সমর্থনই নিরাপদ মাতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
৩৫ বছরের পর গর্ভধারণ মানেই অন্ধকার নয়, আবার একেবারেই ঝুঁকিমুক্তও নয়। প্রয়োজন শুধু বাস্তবতা জানা, সঠিক সময়ে পরিকল্পনা করা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা। কারণ সুস্থ মা মানেই সুস্থ আগামী প্রজন্ম। আর মাতৃত্বের যাত্রায় সবচেয়ে বড় শক্তি বয়স নয়- সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং যত্ন।



