শৈশবে পোষা প্রাণীর সংস্পর্শে গড়ে উঠতে পারে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

কুকুর, বিড়াল কিংবা খামারের গরু-ঘোড়ার মতো প্রাণীর সঙ্গে একসঙ্গে বড় হওয়া শুধু মানসিক স্বস্তিই দেয় না, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে প্রাণীর সংস্পর্শে থাকা শিশুদের অ্যালার্জি, হাঁপানি, একজিমা এমনকি কিছু অটোইমিউন রোগের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

এই ধারণার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামিশ সম্প্রদায়। শতাব্দীপ্রাচীন কৃষিনির্ভর জীবনধারা অনুসরণ করা এই জনগোষ্ঠী এখনও গবাদিপশুর খুব কাছাকাছি বসবাস করে। আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিক বিশ্বে যেখানে শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জি ও হাঁপানির হার ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে অ্যামিশ শিশুদের মধ্যে এসব রোগের হার অনেক কম।
কেন আলাদা অ্যামিশদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা?
২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানায় বসবাসকারী অ্যামিশ শিশুদের সঙ্গে সাউথ ডাকোটার আরেক কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী হাটারাইট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তুলনা করেন গবেষকরা। দুই সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত পরিচয় ও গ্রামীণ জীবনধারায় মিল থাকলেও একটি বড় পার্থক্য ছিল—হাটারাইটরা আধুনিক শিল্পভিত্তিক কৃষিকাজে অভ্যস্ত, আর অ্যামিশরা এখনও প্রতিদিন গবাদিপশুর খুব কাছাকাছি থাকেন।

গবেষণায় দেখা যায়, অ্যামিশ শিশুদের শরীরে রেগুলেটরি টি-সেল বেশি সক্রিয়, যা অস্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। একই সঙ্গে তাদের বাড়ির ধুলায় প্রাণী থেকে আসা নানা ধরনের উপকারী অণুজীবের উপস্থিতিও বেশি পাওয়া যায়।
পোষা প্রাণী ও অ্যালার্জির সম্পর্ক
বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় একই ধরনের ফল মিলেছে। আল্পস অঞ্চলের খামারে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে হাঁপানি, একজিমা ও হে-ফিভারের ঝুঁকি কম দেখা গেছে। আবার শৈশবে যত বেশি পোষা প্রাণীর সঙ্গে শিশুদের বসবাস, পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জির ঝুঁকি তত কম—এ ঘটনাকে গবেষকরা ‘মিনি-ফার্ম ইফেক্ট’ নামে অভিহিত করেছেন।
গবেষকদের মতে, খামারের প্রাণীর সংস্পর্শে বড় হওয়া শিশুদের হাঁপানি বা অ্যালার্জির ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এমনকি শুধু একটি কুকুরের সঙ্গে বড় হলেও ঝুঁকি ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
একজিমা প্রতিরোধে ভূমিকা
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব শিশুর জিনগতভাবে একজিমার ঝুঁকি বেশি ছিল, তাদের জীবনের প্রথম দুই বছরে বাড়িতে কুকুর থাকলে রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, কুকুরের মাধ্যমে পাওয়া কিছু জৈব সংকেত ত্বকের প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, যাদের ইতোমধ্যে একজিমা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন করে কুকুর আনা সবসময় উপকারী নাও হতে পারে, বরং কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গ বাড়তে পারে।
কীভাবে কাজ করে এই প্রভাব?
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রাণীর শরীর ও লোমে থাকা নানা ধরনের অণুজীবের সংস্পর্শে এসে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছোটবেলা থেকেই নানা জীবাণু চিনতে শেখে। ফলে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রবণতা কমে যায়।
যদিও প্রাণীর অণুজীব মানুষের শরীরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে—এমন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে নিয়মিত সংস্পর্শ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে “প্রশিক্ষণ” দেয় বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
প্রাচীন জীবনধারারও মিলছে প্রভাব
আয়ারল্যান্ডের যাযাবর জনগোষ্ঠী নিয়ে করা আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এখনও প্রাণীর কাছাকাছি বসবাস করেন, তাদের অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য আধুনিক নগরবাসীর তুলনায় অনেক বেশি। গবেষকদের মতে, এ কারণেই তাদের মধ্যে কিছু অটোইমিউন রোগ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোষা প্রাণী কোনো “ম্যাজিক সমাধান” নয়। প্রাণীর সংস্পর্শে থেকেও অনেকের অ্যালার্জি হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে গবেষণা বলছে, শৈশবে নিরাপদ পরিবেশে প্রাণীর সঙ্গে বেড়ে ওঠা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া পোষা প্রাণী মানুষকে বাইরে হাঁটতে, প্রকৃতির সংস্পর্শে যেতে এবং মাটি ও পরিবেশের আরও বৈচিত্র্যময় অণুজীবের সঙ্গে পরিচিত হতে উৎসাহিত করে, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যও উপকারী হতে পারে।



