বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
খাবার-দাবার

টেস্টএটলাসের তালিকায় শীর্ষে তুরস্কের ৬ কাবাব

3b3bab35-290f-46fa-82f3-2b9704ea4e71

কাবাব শুধু একটি খাবার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও আনাতোলীয় অঞ্চলের হাজার বছরের রন্ধনঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আগুনে ধীরে ধীরে ঝলসানো মাংসের ধোঁয়াটে সুবাস, বিশেষ মসলার ব্যবহার এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তুতপ্রণালীর কারণে কাবাব আজ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাবারে পরিণত হয়েছে। রাস্তার পাশের ছোট দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্তোরাঁ—সবখানেই কাবাবের রয়েছে আলাদা কদর।

মধ্য এশিয়ার যাযাবর তুর্কি জনগোষ্ঠী আগুনে শিকে গেঁথে মাংস ঝলসানোর যে পদ্ধতি ব্যবহার করত, সেটিই সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়ে আধুনিক কাবাবের ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীতে উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের বিস্তারের মাধ্যমে এই রন্ধনশৈলী ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় তুরস্ক আজও বিশ্বের কাবাব সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।

সম্প্রতি ঐতিহ্যবাহী খাবারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গাইড ও ম্যাগাজিন TasteAtlas বিশ্বের স্বাদের বিচারে সেরা ৫৯টি কাবাবের তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই তালিকায় এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে তুরস্ক। বিশ্বের সেরা ৫৯টি কাবাবের মধ্যে ২১টিই তুরস্কের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কাবাব।

তালিকায় তুরস্কের পর রয়েছে ইরানের ১৩টি কাবাব। এছাড়া ভারতের আটটি, পাকিস্তানের তিনটি এবং এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের কাবাব স্থান পেয়েছে। বিশ্ব কাবাব দিবস উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক টেস্টএটলাসের তালিকায় শীর্ষস্থান পাওয়া তুরস্কের ছয়টি বিখ্যাত কাবাব সম্পর্কে।

Advertisements

ওলতু চাগ কাবাব

টেস্টএটলাসের তালিকার শীর্ষস্থান দখল করেছে উত্তর-পূর্ব তুরস্কের এরজুরুম প্রদেশের ওলতু অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ওলতু চাগ কাবাব। অনেক খাদ্যবিশেষজ্ঞ একে আধুনিক ডোনার কাবাবের অন্যতম পূর্বসূরি বলেও মনে করেন।

এই কাবাব তৈরিতে সাধারণত ভেড়ার মাংস ব্যবহার করা হয়। অল্প লবণ ও হালকা মসলায় মেরিনেট করার পর বড় শিকে গেঁথে কাঠকয়লার আগুনে ধীরে ধীরে রোস্ট করা হয়। বাইরের অংশ সোনালি ও মুচমুচে হয়ে এলে ধারালো ছুরি দিয়ে পাতলা করে কেটে গরম অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। অতিরিক্ত মসলা ব্যবহার না করায় এতে মাংসের প্রাকৃতিক স্বাদই সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে।

তোমবিক দোনার কাবাব

তুরস্কের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডগুলোর মধ্যে অন্যতম তোমবিক দোনার কাবাব। ‘তোমবিক’ বলতে নরম, গোলাকার ও মোটা ধরনের রুটিকে বোঝায়।

এতে কাঠকয়লায় ধীরে ধীরে রোস্ট করা মাংস পাতলা করে কেটে নরম পিদে রুটির মধ্যে ভরা হয়। এরপর যোগ করা হয় টমেটো, পেঁয়াজ, লেটুস, আচারের টুকরা এবং বিভিন্ন ধরনের সস। বাইরে হালকা মুচমুচে রুটি আর ভেতরে রসালো মাংসের অনন্য সংমিশ্রণ এই কাবাবকে তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাস্তার খাবারগুলোর একটি করে তুলেছে।

চোকের্তমে কাবাব

তুরস্কের পর্যটননগরী বোদরুম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার চোকের্তমে কাবাব। স্থানীয় রান্নার ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক পরিবেশনের নান্দনিকতার সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায় এই পদে।

মেরিনেট করা গরুর মাংস হালকা ভেজে খুব পাতলা ও মুচমুচে আলুভাজার ওপর পরিবেশন করা হয়। এর সঙ্গে থাকে রসুন মেশানো ঘন দই এবং মসলাদার টমেটো সস। স্বাদ, গঠন ও পরিবেশনের বৈচিত্র্যের কারণে এটি স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

আলিনাজিক কাবাব

দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের ঐতিহাসিক শহর গাজিয়ানতেপের বিখ্যাত খাবার আলিনাজিক কাবাব। ইউনেসকোর সৃজনশীল গ্যাস্ট্রোনমি শহর হিসেবে স্বীকৃত গাজিয়ানতেপের রান্নার অন্যতম পরিচিত পদ এটি।

আগুনে পোড়ানো বেগুনের শাঁস, ঘন দই ও রসুন দিয়ে তৈরি করা হয় মসৃণ পিউরি। তার ওপর সাজিয়ে দেওয়া হয় গ্রিল করা খাসির মাংস কিংবা কিমা। ধোঁয়াটে বেগুন, টক দই ও রসালো মাংসের অনন্য স্বাদের জন্য এই কাবাব বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে সমাদৃত।

ইসকেনদার কাবাব

তুরস্কের বুরসা শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবারের নাম ইসকেনদার কাবাব। উনিশ শতকে ইস্কান্দার এফেন্দি নামে এক রাঁধুনি প্রথম এই বিশেষ ধরনের কাবাব তৈরি করেন। তার নাম থেকেই এসেছে ‘ইসকেনদার’ নামটি।

এই পদে গ্রিল করা ভেড়ার মাংসের পাতলা টুকরা নরম পিটা রুটির ওপর পরিবেশন করা হয়। এরপর এর ওপর ঢেলে দেওয়া হয় মসলাদার টমেটো সস ও গলানো ভেড়ার দুধের মাখন। সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ঘন দই। স্বাদের ভারসাম্য ও পরিবেশনের স্বাতন্ত্র্যের কারণে এটি তুরস্কের সবচেয়ে পরিচিত কাবাবগুলোর একটি।

আদানা কাবাব

তুরস্কের অন্যতম বিখ্যাত কাবাব শহর আদানার নামানুসারে এই কাবাবের নামকরণ করা হয়েছে। ঝাল স্বাদ এবং বিশেষ মসলার ব্যবহারের জন্য আদানা কাবাব বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

ভেড়ার মাংসের কিমার সঙ্গে লেজের চর্বি, রসুন, পেঁয়াজ, পাপরিকা, শুকনা লাল মরিচের গুঁড়া ও বিভিন্ন স্থানীয় মসলা মিশিয়ে এর মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর বড় ও চ্যাপ্টা লোহার শিকে জড়িয়ে কাঠকয়লার আগুনে ধীরে ধীরে গ্রিল করা হয়।

প্রস্তুত হওয়ার পর পিটা রুটি, গ্রিল করা টমেটো, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজের সালাদ এবং সুমাক মসলা দিয়ে পরিবেশন করা হয়। প্রথাগতভাবে এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় আইরান, যা দই, পানি ও লবণ দিয়ে তৈরি তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের ঠান্ডা পানীয়।

কাবাব কেন তুরস্কের পরিচয়ের অংশ?

তুরস্কে কাবাব শুধু একটি খাবার নয়, বরং অঞ্চলভিত্তিক সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় খাদ্যপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কাবাব রয়েছে, যার উপকরণ, মসলা, রান্নার কৌশল ও পরিবেশনের ধরন একে অন্যের থেকে আলাদা। এই বৈচিত্র্যই তুরস্ককে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ কাবাব সংস্কৃতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাবাব জনপ্রিয় হলেও এর ঐতিহ্য, বৈচিত্র্য এবং শতাব্দীপ্রাচীন রন্ধনশৈলীর কারণে তুরস্ক এখনও কাবাবপ্রেমীদের কাছে অন্যতম সেরা গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

Advertisements
কাবাবটেস্টএটলাসতুরস্ক