বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
বিবিধ

বান্দরবান: ঘরহারা মানুষের শেষ আবেদন, ‘শিশুদের জন্য একটু ভাত চাই’

WhatsApp Image 2026-07-10 at 1.16.22 PM

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বান্দরবান। জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত ১০ হাজার মানুষ। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে পাহাড়ের বন, আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বহু এলাকায় এখনো পৌঁছেনি ত্রাণ সহায়তা। ফলে খাদ্যসংকটে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন বন্যাকবলিত মানুষ।

বান্দরবানের লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ার বাসিন্দা ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমাসহ অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার গত তিন দিন ধরে পাশের একটি পাহাড়ের বনে আশ্রয় নিয়ে আছে। আকস্মিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় তারা ঘর থেকে চাল, কাপড় কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করার সুযোগ পাননি। সঙ্গে নেওয়া শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে।

দুর্গত এসব পরিবারের সদস্যরা বলেন, নিজেদের কষ্টের চেয়ে সন্তানদের খাবার নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তারা। তাদের ভাষায়, ‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু ছোট ছোট শিশুদের তো না খাইয়ে রাখা যায় না। আমাদের জন্য একটু চাল বা রান্না করা ভাতের ব্যবস্থা হলে অন্তত বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারব।’
শুধু লেমুঝিড়ি নয়, জেলার আরও অনেক দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের ত্রাণ কার্যক্রম আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চললেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষের কাছে এখনো সহায়তা পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দরবান পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিশালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া ও লেমুঝিড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় কোমর থেকে গলা সমান পানি জমে রয়েছে। প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছে স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা উঁচু পাহাড়ে।

Advertisements

লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেও খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন তারা।

এদিকে জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে নৌকায় মানুষ পারাপার করছেন। কোথাও ভ্যানে, কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে ১০ টাকার ভাড়ার জন্য এখন অনেককে ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা উমং প্রু মারমা জানান, অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে সদর হাসপাতালে যেতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পানিতে তলিয়ে থাকা সড়ক পেরোতে অতিরিক্ত ভাড়াও দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবছর এ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। সড়কের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। বুধবার রাত পর্যন্ত শুধু সদর উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রেই প্রায় চার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অন্যান্য উপজেলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। একইভাবে সাঙ্গু নদীর পানিও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমতা আফরিন বলেন, বন্যাকবলিত বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি অন্যান্য মানুষের কাছেও পর্যায়ক্রমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানান, পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার সব আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে থাকা মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisements
নাইক্ষ্যংছড়িবন্যাবান্দরবানমারমাশিশু