বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
স্বাস্থ্য

প্রথমবার এইচআইভি পজিটিভ দাতার ফুসফুস প্রতিস্থাপনে সাফল্য

প্রথমবার এইচআইভি পজিটিভ দাতার ফুসফুস প্রতিস্থাপনে সাফল্য

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের সার্জনরা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন । প্রথমবার একজন এইচআইভি পজিটিভ রোগীর শরীরে অপর এক এইচআইভি পজিটিভ মৃত ব্যক্তির ফুসফুস সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

চলতি বছরের গত ২১ মার্চ এই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিশাল অগ্রগতি। এর ফলে শেষ ধাপের ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত এইচআইভি পজিটিভ রোগীদের জন্য অঙ্গ পাওয়ার একটি নতুন পথ উন্মোচন হলো। এতদিন পর্যন্ত এইচআইভি পজিটিভ রোগীরা কেবল এইচআইভি নেগেটিভ দাতাদের কাছ থেকেই অঙ্গ পেয়ে আসছিলেন।

এইচআইভি পজিটিভ দাতার ফুসফুস ব্যবহারের এই সফল প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে অঙ্গের তীব্র সংকট দূর করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘হোপ অ্যাক্ট’ কাঠামোর আওতায় এই জটিল অস্ত্রোপচারটি করা হয়। এই আইনের অধীনে অত্যন্ত সতর্ক পর্যবেক্ষণে রেখে এইচআইভি পজিটিভ দাতার অঙ্গ অন্য একজন এইচআইভি পজিটিভ রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়।

গবেষকদের বিশ্বাস, এই সফলতা বিশ্বজুড়ে এ ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথ জানিয়েছে, ফুসফুস গ্রহণকারী ৫৬ বছর বয়সি বার্ট্রান্ড নেলসন গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন। তিনি ‘সারকোইডোসিস’ নামক একটি মারাত্মক প্রদাহজনিত রোগে ভুগছিলেন, যা তার ফুসফুস ও লিভারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০২১ সালে গুরুতর লিজিয়েনিয়ার্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তার অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং তাকে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপোর্টে থাকতে হতো।

গত ২১ মার্চ চিকিৎসকরা তার শরীরে এক এইচআইভি পজিটিভ দাতার দুটি ফুসফুস এবং একই সঙ্গে একটি লিভার সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেন। অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পর নেলসন এখন বেশ সুস্থ আছেন এবং দীর্ঘ চার বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো কৃত্রিম সাপোর্ট ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছেন।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ড. সপ্না মেহতা বলেন, ‘এটি এইচআইভি পজিটিভ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।’

কেন এই সাফল্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৯৯ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে জীবনযাপন করছেন। আধুনিক অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির কল্যাণে এখন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরাও সাধারণ মানুষের মতোই দীর্ঘায়ু পাচ্ছেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যার জন্য অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে অঙ্গের ঘাটতি চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এইচআইভি পজিটিভ দাতাদের অঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি মেলায় এখন অঙ্গের প্রাপ্যতা অনেক বাড়বে এবং রোগীদের অপেক্ষার সময় কমে আসবে। গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছিলেন যে, কেবল এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার কারণে কোনো অঙ্গকে বাতিল করে দেওয়া জীবন বাঁচানোর সুযোগকে সংকীর্ণ করে দেয়।

‘হোপ অ্যাক্ট’ এর ভূমিকা

২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া ‘হোপ অ্যাক্ট’ দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, যা এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তির অঙ্গ অন্য রোগীর শরীরে ব্যবহারে বাধা দিত। এরপর থেকে এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনে দারুণ সাফল্য পাওয়া গেছে।

‘আমেরিকান জার্নাল অব ট্রান্সপ্লান্টেশন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এইচআইভি পজিটিভ দাতার লিভার প্রতিস্থাপনের ফলাফল এবং এইচআইভি নেগেটিভ দাতার লিভার প্রতিস্থাপনের ফলাফলের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। এই গবেষণাই মূলত চিকিৎসকদের আত্মবিশ্বাস জোগায়।

তবে ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা ছিল সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ ফুসফুস সরাসরি বাইরের বাতাস ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসে, যার ফলে অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশন বা শরীর দ্বারা অঙ্গটি প্রত্যাখ্যান হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। আর এই কারণেই ফুসফুস প্রতিস্থাপনের এই সাফল্যকে এত বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এইচআইভি আক্রান্তদের জন্য ফুসফুস প্রতিস্থাপন কতটা নিরাপদ?

অতীতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ইনফেকশনের আশঙ্কায় এইচআইভি আক্রান্তদের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অনুপযুক্ত মনে করা হতো। কিন্তু অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসার অভাবনীয় উন্নতি সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।

‘ট্রান্সপ্লান্টেশন প্রসিডিংস’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, যেসব এইচআইভি রোগীর ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাদের ফুসফুস প্রতিস্থাপনের ফলাফল একদম সাধারণ রোগীদের মতোই ইতিবাচক হয়। বিশেষজ্ঞরা জানান, সফল প্রতিস্থাপনের মূল চাবিকাঠি হলো ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ওষুধের সঠিক সমন্বয় এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণ।

ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সফলতার পর বিশ্বের অন্যান্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও এখন এই পদ্ধতি অনুসরণে এগিয়ে আসবে। এর ফলে অঙ্গের ঘাটতি কমে আসবে এবং রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পাবেন। এই অর্জন গত তিন দশকে এইচআইভি চিকিৎসার অভূতপূর্ব অগ্রগতিকেই প্রমাণ করে—যে রোগটিকে একসময় নিশ্চিত মৃত্যু বলে ভাবা হতো, তা আজ একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা এবং এর মাধ্যমে ফুসফুস প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অস্ত্রোপচারও সফলভাবে করা সম্ভব।

এইচআইভিপ্রতিস্থাপনফুসফুস