বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
বিবিধ

জাপানে বিড়াল অর্থনীতির তুমুল জোয়ার; বছরে ব্যয় লাখ লাখ টাকা!

persian_cat1_20250623_133010449

জাপানের ওসাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পোষা প্রাণী মেলা ‘ইন্টারপেট ওসাকা’ বহু বছর ধরেই এশিয়ার অন্যতম বড় পেট-ইন্ডাস্ট্রি প্রদর্শনী হিসেবে পরিচিত। কুকুর, পাখি, ছোট প্রাণী থেকে শুরু করে পোষা প্রাণীর আধুনিক যত্ন-প্রযুক্তি- সবকিছুই এখানে এক ছাদের নিচে উঠে আসে। কিন্তু এবারের আয়োজনের সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন ছিল একেবারেই আলাদা- বিড়ালদের জন্য বিশেষ জোন ‘ইন্টারক্যাটস’।

এই প্রথমবারের মতো মেলার ভেতরে বিড়ালকেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ জোন আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে, যা শুধু একটি প্রদর্শনী নয়- বরং জাপানের পরিবর্তিত পোষা প্রাণী সংস্কৃতির একটি প্রতিফলনও বটে।

বিড়ালকে কেন্দ্র করে নতুন ভাবনা

জাপানে গত কয়েক বছরে পোষা প্রাণীর মধ্যে বিড়ালের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শহুরে জীবন, ছোট অ্যাপার্টমেন্ট এবং ব্যস্ত কর্মজীবনের কারণে অনেকেই এখন কুকুরের তুলনায় বিড়ালকে বেশি উপযুক্ত সঙ্গী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। বিড়াল তুলনামূলকভাবে কম যত্নে মানিয়ে নিতে পারে, শান্ত স্বভাবের এবং স্বাধীনচেতা- এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাদের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

এই পরিবর্তিত সামাজিক প্রবণতাকেই মাথায় রেখে ‘ইন্টারক্যাটস’ জোনটি তৈরি করা হয়েছে। আয়োজকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি আলাদা সেকশন নয়; বরং বিড়ালপ্রেমীদের জন্য একটি “ইমারসিভ এক্সপেরিয়েন্স জোন”, যেখানে পুরো পরিবেশই বিড়ালকে কেন্দ্র করে সাজানো।

কী থাকছে ‘ইন্টারক্যাটস’-এ

এই বিশেষ জোনে প্রবেশ করলে দর্শনার্থীরা এক ধরনের ভিন্ন জগতে প্রবেশ করেন। এখানে রয়েছে-

১. প্রিমিয়াম ক্যাট ফুড ও নিউট্রিশন স্টল:
বিড়ালের বয়স, স্বাস্থ্য এবং জাত অনুযায়ী বিশেষভাবে তৈরি খাবার প্রদর্শন করা হচ্ছে। অনেক স্টলেই দেখা গেছে অর্গানিক এবং প্রিজারভেটিভ-ফ্রি খাবারের ওপর বাড়তি গুরুত্ব।

২. স্মার্ট ক্যাট টেকনোলজি:
স্বয়ংক্রিয় লিটার বক্স, AI-ভিত্তিক হেলথ মনিটরিং কলার, এবং মোবাইল অ্যাপ-নিয়ন্ত্রিত ফিডার- সবই রয়েছে এখানে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিড়ালের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং স্বাস্থ্য ট্র্যাক করার নতুন সমাধানগুলো দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।

৩. খেলনা ও এনরিচমেন্ট জোন:
বিড়ালের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তৈরি ইন্টারঅ্যাকটিভ খেলনা, ক্লাইম্বিং স্ট্রাকচার এবং রিল্যাক্সেশন স্পেসও প্রদর্শিত হচ্ছে। অনেক পণ্যই ডিজাইন করা হয়েছে ইনডোর ক্যাটদের সক্রিয় রাখতে।

৪. ভেটেরিনারি ও হেলথ কেয়ার কর্নার:
বিশেষজ্ঞ পশু চিকিৎসকরা এখানে বিড়ালের রোগ, টিকা, এবং দীর্ঘমেয়াদি যত্ন নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। আধুনিক ডায়াগনস্টিক টুলস ও ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড ব্যবস্থাও তুলে ধরা হয়েছে।

বিড়াল সংস্কৃতির নতুন বাণিজ্যিক দিগন্ত

‘ইন্টারক্যাটস’ শুধু প্রদর্শনীর জন্য নয়, বরং একটি বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ইঙ্গিতও বহন করছে। জাপানের পোষা প্রাণী শিল্পে এখন বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে, যার একটি বড় অংশই বিড়ালকেন্দ্রিক পণ্য ও সেবার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে “ক্যাট প্যারেন্টিং” ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যেখানে মানুষ বিড়ালকে শুধু পোষা প্রাণী নয়, পরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে। এই মানসিক পরিবর্তনই নতুন ধরনের পণ্য ও সেবার চাহিদা তৈরি করছে- যা ‘ইন্টারক্যাটস’-এ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

পরিবেশ ও আবেগের সংযোগ

এই জোনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ডিজাইন ও পরিবেশ। আলো, সাউন্ড এবং স্পেস- সবকিছুই এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে বিড়াল-সুলভ শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়। দর্শনার্থীরাও এখানে এসে শুধু পণ্য দেখেন না, বরং একটি “ক্যাট-লাইফস্টাইল এক্সপেরিয়েন্স” অনুভব করেন। অনেক স্টলেই বিড়ালদের জন্য রিল্যাক্সেশন কর্নার রাখা হয়েছে, যেখানে তারা স্বাভাবিক আচরণে অংশ নিতে পারে। এটি শুধু প্রদর্শনীর নয়, প্রাণীকল্যাণের দিক থেকেও একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘ইন্টারক্যাটস’ ভবিষ্যতে পোষা প্রাণী মেলার কাঠামোই বদলে দিতে পারে। আগে যেখানে সাধারণভাবে সব প্রাণীকে একসঙ্গে উপস্থাপন করা হতো, এখন সেখানে পৃথক ক্যাটাগরি-ভিত্তিক অভিজ্ঞতা তৈরি করা হচ্ছে।
এটি শুধু জাপানেই সীমাবদ্ধ নয়- বিশ্বব্যাপী পোষা প্রাণী শিল্পেও এমন আলাদা থিম জোনের ধারণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ‘ইন্টারক্যাটস’ আসলে শুধু একটি প্রদর্শনী জোন নয়; এটি আধুনিক শহুরে জীবনের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্কের একটি নতুন ভাষা। প্রযুক্তি, আবেগ, ব্যবসা এবং প্রাণীপ্রেম- সবকিছু মিলিয়ে এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, পোষা প্রাণীর জগৎ এখন আর শুধু যত্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনধারার অংশ হয়ে উঠছে।

জাপানের এই নতুন পদক্ষেপ হয়তো ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে বিড়াল-সংস্কৃতির নতুন অধ্যায় শুরু করবে।

অর্থনীতিজনপ্রিয়তাজাপানবিড়াল