আমের মৌসুমে বদলে যায় জীবন, আয় বাড়ছে খাগড়াছড়ির নারীদের

সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় তাঁদের দিনের কর্মযজ্ঞ। হাতে ঝুড়ি, কাঁধে ক্রেট নিয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পৌঁছে যান আমবাগানে। এরপর কেউ গাছ থেকে আম সংগ্রহ করেন, কেউ বাছাই করেন, আবার কেউ বাজারজাতের জন্য ঝুড়িভর্তি আম বহন করেন। আমের মৌসুমে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য এখন খুবই পরিচিত।
সারা বছর ঘর-সংসারের দায়িত্বে ব্যস্ত থাকলেও আমের মৌসুম এলেই অনেক পাহাড়ি নারীর জীবনে যুক্ত হয় নতুন কর্মব্যস্ততা। পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে তাঁরা যুক্ত হচ্ছেন আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকেটজাতকরণের কাজে। এতে যেমন আয় বাড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে আত্মনির্ভরতার নতুন সুযোগ।
পানছড়ি উপজেলার দুদুকছড়া এলাকার বিভিন্ন আমবাগানে এখন চলছে ফল সংগ্রহের ব্যস্ত সময়। সেখানকার নারী শ্রমিক অনিতা চাকমা জানান, আমের মৌসুমে প্রতিদিন বাগানে কাজ করে প্রায় ৪০০ টাকা আয় করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “এই অতিরিক্ত আয় সংসারের খরচ সামলাতে অনেক সাহায্য করে। পাশাপাশি অন্য নারীদের সঙ্গে কাজ করতে ভালোও লাগে।”

মিতা ত্রিপুরা বলেন, আম সংগ্রহের কাজ মোটেও সহজ নয়। কখনো গাছে উঠতে হয়, কখনো ভারী ক্রেট বহন করতে হয়। তবু পরিবারের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দ সব কষ্টকে ছাপিয়ে যায়।
শুধু এককভাবে নয়, অনেক ক্ষেত্রে দলবদ্ধভাবেও কাজ করছেন নারীরা। স্থানীয় কয়েকজন নারী মিলে বাগানমালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে নির্দিষ্ট পরিমাণ আম সংগ্রহের দায়িত্ব নেন। এতে দৈনিক মজুরির পাশাপাশি অতিরিক্ত উপার্জনের সুযোগও তৈরি হয়।
খাগড়াছড়ি সদরের শান্তি ত্রিপুরা জানান, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাঁদের। দিনের শুরুতে ঘরের কাজ শেষ করে বাগানে যেতে হয়, আবার ফিরে সংসারের দায়িত্বও সামলাতে হয়। ফলে কাজের চাপ থাকলেও বাড়তি আয়ের কারণে তাঁরা এই পরিশ্রমকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন।
অন্যদিকে বাগানমালিকদের কাছেও নারীদের অংশগ্রহণ আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। স্থানীয় বাগানমালিক মংপ্রু মারমা বলেন, আমের মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় নারীরা দায়িত্বশীলভাবে কাজ করায় শ্রমিক সংকট কমে এবং ফলের অপচয়ও হ্রাস পায়।

আমচাষি সুজন চাকমার মতে, আগে আম সংগ্রহের সময় পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া কঠিন ছিল। এখন স্থানীয় নারীরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে এবং দ্রুত বাজারে আম পাঠানো যাচ্ছে।
বাগানমালিক হ্লামংচিং মারমা জানান, নারীরা শুধু আম সংগ্রহেই নয়, বাছাই ও প্যাকেটজাত করার কাজেও দক্ষতা দেখাচ্ছেন। ফলে আমের গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও কিছুটা কমছে।
গত কয়েক বছরে খাগড়াছড়িতে আমের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন নতুন বাগান গড়ে ওঠায় মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ছে। এর সুফল পাচ্ছেন পাহাড়ি নারীরা, যাঁরা নিজেদের শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে পরিবারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে ফল উৎপাদন ও সংগ্রহে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তিনি মনে করেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হলে নারীরা আরও দক্ষ হয়ে উঠবেন এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান আরও বাড়বে।



