ঢেউকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে: কক্সবাজারের ফাতেমার স্বপ্নযাত্রা

বাংলাদেশে ফুটবল বা ক্রিকেটের উন্মাদনার ভিড়ে খুব কম মানুষই জানেন, দেশের দক্ষিণের সমুদ্রতীর থেকে নীরবে উঠে আসছে একদল তরুণ-তরুণী, যারা উত্তাল ঢেউকে সঙ্গী করে লিখছে নতুন ইতিহাস। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় তাদের যুদ্ধ- প্রতিপক্ষ কোনো মানুষ নয়, বরং প্রকৃতির বিশাল ঢেউ।
সেই যুদ্ধের উজ্জ্বল নাম ফাতেমা আক্তার। প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের সার্ফিং ইভেন্টে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এই আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন তিনি। দেশের সার্ফিং ইতিহাসে এটি এক অনন্য মাইলফলক।

ভয় থেকে ভালোবাসা
আজ যে ফাতেমা আক্তার ঢেউয়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সার্ফিং বোর্ড চালান, একসময় সেই ফাতেমাই সমুদ্রের গর্জন শুনে ভয় পেত। মহেশখালীর মেয়ে ফাতেমার পরিবার জীবিকার সন্ধানে চলে আসে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায়। বাবা ফকির আহমদ একটি হোটেলের পাশে ছোট্ট পান দোকান চালিয়ে সংসার চালান।
শৈশবে সমুদ্রের কাছে যেতে ভয় পাওয়া ফাতেমাকে একদিন সার্ফিং শেখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু সে রাজি হয়নি। বারবার না বলেছিল। পরে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার নাসিমার গল্প শুনে তার মনে আগ্রহ জন্মায়।

প্রথম দিন ঢেউয়ের ধাক্কা খেয়ে কেঁদে ফেলেছিল ছোট্ট মেয়েটি। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। সেই কান্নার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল এক নতুন যাত্রা। ধীরে ধীরে ভয়কে জয় করে সে হয়ে ওঠে দক্ষ সার্ফার।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাইকে চমকে দেয় ফাতেমা। বয়সে বড় ও অভিজ্ঞ প্রতিযোগীদের হারিয়ে অর্জন করে শিরোপা। এখন তাকে অনেকেই বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের ‘বিস্ময় বালিকা’ বলে ডাকেন।
কক্সবাজার: সার্ফিংয়ের স্বর্গ
বিশ্বে সার্ফিংয়ের কথা উঠলেই অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার নাম আসে। কিন্তু সার্ফারদের মতে, কক্সবাজারও হতে পারে বিশ্বের অন্যতম সেরা সার্ফিং গন্তব্য।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ও প্রশিক্ষক সাইফুল্লাহ সিফাতের ভাষায়, কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা এর বালুময় সৈকত। বিশ্বের অনেক জনপ্রিয় সার্ফিং স্পটে পাথর ও প্রবাল থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু কক্সবাজারে সেই ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তাই নতুনদের জন্য এটি একটি আদর্শ প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র। এখানকার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, নিয়মিত ঢেউ এবং নিরাপদ পরিবেশ সার্ফিংয়ের জন্য অনন্য।
বিদেশি পর্যটকদের অনেকেও এই সম্ভাবনা স্বীকার করেন। কক্সবাজারে আসা অস্ট্রেলিয়ান পর্যটক ও সার্ফার পেড্রিক হার্স বলেন, “আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সার্ফিং করেছি। কিন্তু কক্সবাজারের বালুময় সৈকতে সার্ফিংয়ের অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ।”
স্বপ্নের পথে বাধা

তবে সার্ফিংয়ের এই সাফল্যের গল্পের আড়ালে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। একটি মানসম্মত সার্ফিং বোর্ড কিনতে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অনেক সার্ফার পুরোনো বা বিদেশিদের ফেলে যাওয়া বোর্ড ব্যবহার করেন।
প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের খরচও কম নয়। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য সামাজিক বাধা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার নাসিমা একসময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্ভাবনা দেখালেও পারিবারিক কারণে খেলা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা ভাবায় ফাতেমাকেও। সে জানে, শুধু প্রতিভা থাকলেই হবে না, দরকার দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও সামাজিক স্বীকৃতি।
নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ৭০ জন সার্ফার নিয়মিত অনুশীলন করেন, যাদের মধ্যে ১৭ জন নারী। প্রতিদিন ভোরে তারা নেমে পড়েন ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াইয়ে। পর্যটকেরা মুগ্ধ হয়ে দেখেন ঢেউয়ের মাথায় দাঁড়িয়ে তাদের দুরন্ত ছুটে চলা। একসময় যা কেবল বিদেশি সিনেমার দৃশ্য বলে মনে হতো, আজ তা বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকতেই বাস্তব।
ফাতেমার সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের সম্ভাবনার প্রতীক। তাদের গল্প প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরাও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে।
সমুদ্রের ঢেউ প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। কক্সবাজারের এই নারী সার্ফারের গল্পও যেন সেই ঢেউয়ের মতো- বারবার বাধার মুখে পড়েও এগিয়ে যাওয়ার গল্প। হয়তো একদিন বিশ্ব সার্ফিংয়ের মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করা হবে আরও জোরে, আর সেই ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ফাতেমা আক্তারের নাম।



