পরিবারের সেই নীরব সদস্য: মেজো সন্তান

পরিবারে প্রথম সন্তানকে ঘিরে থাকে প্রত্যাশা, আর সবচেয়ে ছোট সন্তানকে ঘিরে থাকে বাড়তি আদর। তাহলে মাঝখানের সন্তানের জায়গা কোথায়- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মনোবিজ্ঞানের জগতে আলোচনা চলছে বহুদিন ধরে।
সাধারণ ধারণা হলো, পরিবারের মেজো সন্তান অনেক সময় দুই প্রান্তের মাঝখানে পড়ে এক ধরনের উপেক্ষার অনুভূতি নিয়ে বড় হয়। বড় সন্তানের ওপর দায়িত্ব আর ছোট সন্তানের প্রতি বাড়তি যত্ন-এই দুইয়ের ভিড়ে মেজো সন্তান যেন একটু আড়ালেই থেকে যায়। এই অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হতে পারে নিঃসঙ্গতা, আবার অন্যদিকে গড়ে উঠতে পারে স্বাধীনচেতা, সমঝোতামূলক বা কখনো বিদ্রোহী স্বভাব।
‘মিডল চাইল্ড সিনড্রোম’- মনোবিজ্ঞানের এই বহুল আলোচিত ধারণার সূত্রপাত করেন অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলার। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তিনি বলেন, জন্মক্রম মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, প্রথম সন্তান সাধারণত দায়িত্বশীল ও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠে, ছোট সন্তান হয় আদুরে, আর মেজো সন্তান নিজের অবস্থান খুঁজতে গিয়ে ভিন্নধর্মী মানসিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবেষণায় এসেছে ভিন্ন ভিন্ন মত। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মেজো সন্তানদের ব্যক্তিত্ব অনেক সময় চাপা বা ভারসাম্যপূর্ণ হয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তারা কখনো মনে করতে পারে, তারা অন্য ভাইবোনদের মতো সমান গুরুত্ব পাচ্ছে না। আবার পরিবারের দ্বন্দ্বে তাদের প্রায়ই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখা যায়।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা মেজো সন্তানদের ভিন্ন এক শক্তির দিকও তুলে ধরছে। ২০২৪ সালে বড় পরিসরে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মেজো সন্তানেরা তুলনামূলকভাবে বেশি সহযোগিতাপ্রবণ, সহনশীল এবং সমঝোতামূলক হতে পারে। বড় ও ছোট ভাইবোনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়েই তাদের এই দক্ষতা তৈরি হয় বলে মনে করেন গবেষকেরা।
জাপানে পরিচালিত একটি গবেষণায় আবার দেখা গেছে, কৈশোরে মেজো সন্তানেরা কিছুটা কম সুখী হতে পারে, তবে তাদের মানসিক জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, জন্মক্রমের ভিত্তিতে ব্যক্তিত্ব বা মানসিক বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশের মত হলো, জন্মক্রম কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে ঠিকই, তবে সেটিই একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। পরিবারে পরিবেশ, বাবা-মায়ের আচরণ, সামাজিক ও জৈবিক নানা উপাদান মিলেই গড়ে ওঠে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব।
তাই মেজো সন্তানকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে ‘মাঝখানের সন্তান’ হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে দেখা। কারণ প্রতিটি শিশুই আলাদা-তার অবস্থান নয়, তার পরিচয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



