১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

ক্র্যাব মেন্টালিটি: অন্যকে টেনে নামানোর অদৃশ্য সামাজিক রোগ

images (3)


“আমি না পারলে, তুমিও পারবে না”- এই একটি বাক্যেই যেন লুকিয়ে আছে ক্র্যাব মেন্টালিটির পুরো দর্শন। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা নিজেরা এগোতে না পারলেও অন্যের এগিয়ে যাওয়া সহ্য করতে পারেন না। ফলে তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অন্যের সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকেই বলেন ক্র্যাব মেন্টালিটি। এই ধারণার উৎস একটি পরিচিত উপমা। একটি ঝুড়িতে অনেকগুলো কাঁকড়া রাখা হলে দেখা যায়, কোনো একটি কাঁকড়া উপরে উঠে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে অন্য কাঁকড়াগুলো তাকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে। ফলে কেউই ঝুড়ি থেকে বের হতে পারে না। মানুষের সমাজেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়।

সাফল্যের শত্রু কে?

ধরা যাক, একটি গ্রামের ছেলে কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। তাকে অভিনন্দন জানানোর বদলে কেউ বলল, “ও তো ভাগ্যবান ছিল।” আবার কোনো নারী নিজের ব্যবসা শুরু করলে অনেকে মন্তব্য করল, “কদিন পরই বন্ধ হয়ে যাবে।”
এ ধরনের মন্তব্যগুলো হয়তো সাধারণ কথা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকে অন্যের সাফল্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। অনেক সময় কাছের বন্ধু, সহকর্মী কিংবা আত্মীয়রাও অজান্তে এই মানসিকতার শিকার হয়ে যান।
কেন জন্ম নেয় এই মানসিকতা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্র্যাব মেন্টালিটির মূল কারণ হলো তুলনা, অনিরাপত্তাবোধ এবং ঈর্ষা। যখন কেউ মনে করেন অন্যের সাফল্য তার নিজের ব্যর্থতাকে সামনে এনে দেয়, তখন তিনি সেই সাফল্যকে খাটো করার চেষ্টা করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। অন্যের অর্জন, ভ্রমণ, পদোন্নতি কিংবা সুখের মুহূর্ত দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে কম সফল মনে করেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।

কর্মক্ষেত্রে নীরব বিষ

Advertisements

অফিসে ক্র্যাব মেন্টালিটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। একজন কর্মী ভালো কাজ করলে সহকর্মীরা যদি সহযোগিতা করার বদলে তার ভুল খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে পুরো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা কমে যায়।

অনেক প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায়, দক্ষ কর্মীদের উৎসাহিত করার পরিবর্তে তাদের নিয়ে গুজব ছড়ানো হয় বা তাদের সাফল্যকে অবমূল্যায়ন করা হয়। ফলে প্রতিভাবান মানুষরা হতাশ হয়ে পড়েন এবং কর্মপরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
পরিবারেও আছে এর প্রভাব

অবাক করার বিষয় হলো, ক্র্যাব মেন্টালিটি শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, পরিবারেও দেখা যায়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কে বেশি সফল, কার সন্তান ভালো ফল করল, কার আয় বেশি- এসব তুলনা থেকে তৈরি হয় অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। যেখানে উৎসাহ দেওয়ার কথা, সেখানে শুরু হয় সমালোচনা। আর এভাবেই সম্পর্কের ভেতরে ঢুকে পড়ে দূরত্ব।

মুক্তির উপায় কী?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবে না দেখে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক মানুষের যাত্রাপথ আলাদা। তাই তুলনার বদলে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে সমাধান। কাউকে নিচে নামিয়ে কেউ কখনো উপরে উঠতে পারে না। বরং অন্যকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করলে সমাজও এগিয়ে যায়, নিজের পথও আরও উন্মুক্ত হয়।

ক্র্যাব মেন্টালিটি কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। এই মানসিকতা যতদিন থাকবে, ততদিন প্রতিভা বাধাগ্রস্ত হবে, স্বপ্ন থমকে যাবে। তাই সময় এসেছে ঝুড়ির কাঁকড়ার মতো একে অন্যকে টেনে নামানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একে অন্যকে ওপরে তুলে ধরার। কারণ সাফল্যের সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো- নিজে এগোনো এবং অন্যকেও এগিয়ে যেতে সাহায্য করা-

Advertisements