বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
এডিটরস পিক

আপনিও কি নিজেকে ‘স্ট্রং’ প্রমাণের চেষ্টায় ব্যস্ত?

1520078172824

মাঝ রাতে কখনও আপনার ওপরও কি বিষণ্ণতা ভর করে? তখন সাধারণত কাউকে ফোন করার কথা আপনি ভাবতে পারছেন না। কারণ ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়েছে যে নিজের সমস্যা নিজেকেই সামলাতে হয়। কাউকে বিরক্ত করা ঠিক নয় আর নিজেকে দুর্বল দেখানোও উচিত নয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘হাইপার-ইন্ডিপেনডেন্স’

এমন মানুষের সংখ্যা চারপাশে কম নয়। বাইরে থেকে তাদের দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর মনে হয়। তারা একাই সব সামলানোর চেষ্টা করেন, খুব কম সাহায্য চান এবং নিজের কষ্ট নিয়েও সহজে কথা বলেন না। ফলে আশপাশের মানুষও প্রায়ই ধরে নেয়, তারা সব পরিস্থিতি সামলে নিতে সক্ষম।

তবে এই দৃঢ়তার আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ক্লান্তি, ভয়, একাকিত্ব কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ। সবকিছু একা বহন করার অভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষকে অন্যদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

‘হাইপার-ইন্ডিপেনডেন্স’-এমন একটি একটি প্রবণতা, যেখানে একজন মানুষ প্রয়োজন থাকলেও অন্যের সহায়তা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন।

Advertisements

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মনির্ভরতা ও স্বাধীন জীবনযাপনের ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া এবং অন্যের ওপর কম নির্ভর করাকে ইতিবাচক গুণ হিসেবে দেখা হয়। তবে স্বাধীনতা আর কাউকে প্রয়োজন না হওয়ার মানসিকতা এক নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ স্বাধীনতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, কিন্তু হাইপার-ইন্ডিপেনডেন্স এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে প্রয়োজনের সময়ও সাহায্য চাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে মানসিক চাপ বাড়তে পারে এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

হাইপার-ইন্ডিপেনডেন্স বা অতিরিক্ত আত্মনির্ভরতার প্রবণতা সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। শৈশবের অভিজ্ঞতা, বারবার হতাশ হওয়া, পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থন না পাওয়া কিংবা ছোটবেলা থেকে ‘নিজের সমস্যা নিজেকেই সামলাতে হবে’—এ ধরনের বার্তা শুনে বড় হওয়ার ফলেও এটি গড়ে উঠতে পারে। অনেকেই অল্প বয়সেই শিখে যান, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা নিরাপদ নয়।

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতাও এ প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। ছেলেদের প্রায়ই শেখানো হয়, কাঁদা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা ঠিক নয়। অন্যদিকে অনেক মেয়েও বড় হন নিজের কষ্ট চেপে রাখা এবং সব পরিস্থিতি নীরবে সহ্য করার শিক্ষা নিয়ে। ফলে আবেগ প্রকাশের বদলে তা ভেতরে জমিয়ে রাখার অভ্যাস তৈরি হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সেখানে এমন জীবনধারাকে প্রায়ই আদর্শ হিসেবে দেখানো হয়, যেখানে একজন মানুষ একাই সবকিছু সামলে নিচ্ছেন। তবে স্বাধীনতা ইতিবাচক হলেও, নিজের ভয়, কষ্ট বা মানসিক প্রয়োজনগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করা উচিত নয়।

এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সম্পর্কের ওপর। যারা সবসময় নিজেকে শক্ত দেখাতে চান, তারা অনেক সময় বন্ধু, পরিবার বা কাছের মানুষদের কাছেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন না। কেউ খোঁজ নিলে ‘আমি ঠিক আছি’ বলেই এড়িয়ে যান। ফলে অজান্তেই সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।

তবে এই অভ্যাস বদলানো সম্ভব। পরিবর্তন শুরু হতে পারে ছোট ছোট পদক্ষেপ থেকে। খারাপ লাগার কথা একজন বিশ্বস্ত মানুষকে জানানো, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়া কিংবা সব সময় নিজেকে শক্ত প্রমাণ করার চেষ্টা না করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকের মনে হয় সাহায্য চাইলে অন্যরা বিরক্ত হবে। অথচ বাস্তবে প্রিয়জনেরা সাধারণত পাশে দাঁড়াতেই চান। বরং নিজের সব অনুভূতি আড়াল করে রাখলে একাকিত্ব আরও বাড়তে পারে। কারণ মানুষের জন্য অন্যের ওপর ভরসা করা, সমর্থন চাওয়া এবং দুর্বল মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়া একেবারেই স্বাভাবিক মানবিক চাহিদা।

মজার বিষয় হলো, যারা অন্যদের সবসময় বলেন ‘প্রয়োজনে জানিও’, তারাই অনেক সময় নিজের প্রয়োজনের কথা কাউকে বলতে পারেন না। দীর্ঘদিন একা সব সামলাতে সামলাতে অনেকেই ভুলে যান যে কারও ওপর ভরসা করাও দুর্বলতা নয়, বরং সুস্থ সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

Advertisements
বিষণ্ণতামানসিকহাইপার-ইন্ডিপেনডেন্স