বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
বিবিধ

নিঃসঙ্গ ঘরে পচে ছিল মায়ের দেহ, প্রতিক্রিয়ায় ফখরুলকন্যার পোস্ট

sa_105.1766059704

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর ১১-তে একটি বাসা থেকে নুরজাহান বেগম (৭২) নামে এক বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাকে ঘিরে দেশে প্রবীণদের নিরাপত্তা, পরিচর্যা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় বুধবার (৩ জুন) বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কন্যা ড. শামারুহ মির্জা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

পোস্টে শামারুহ মির্জা লেখেন, ‘বাংলাদেশে এক মায়ের মৃত্যু আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। এই মৃত্যুর তদন্তের আগে, ঘরের ভয়াবহ অবস্থার জন্য পরিবারকে অবশ্যই দায়ী করতে হবে। এই অবস্থা এক দিনে হয়নি। দিনের পর দিন ধরে এটা হয়েছে। নো ম্যাটার হোয়াট। অন এ সিরিয়াস নোট।

বাংলাদেশে ‘এজিং কেয়ার’-এর কী অবস্থা? সরকার কী করছে এই এরিয়াতে? চটকদার পপুলিজমে না গিয়ে একটি দেশের উন্নয়নের আসল নির্ণায়কগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে হবে। অস্ট্রেলিয়াতে হেলথ মিনিস্ট্রির ফুল টাইটেল হচ্ছে ‘ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ, ডিসেবিলিটি অ্যান্ড এজিং’।

এজিং কেয়ার একটা বড় ইস্যু উল্লেখ করে ফখরুলকন্যা বলেন, বারবার বলছি, বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ ইস্যু নিয়ে আলোচনা প্রচুর হচ্ছে, কিন্তু আসলেই ইমপ্যাক্টফুল কাজ কি হচ্ছে? বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়ার এজড কেয়ার ব্যবস্থা থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে ধারণা হলো পরিবারের সদস্যরাই বয়স্কদের দেখাশোনা করবে। এটাই সুন্দর এবং উচিত। আল্লাহর নির্দেশ। যারা করতে পারে, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যারা পারে না, বাংলাদেশের কনটেক্সটে কি করা যেতে পারে?

এ বিষয়ে কয়েকটি দিকে আলোকপাত করেছেন শামারুহ মির্জা। সেগুলো হলো—

১. বাড়িভিত্তিক সেবার ওপর জোর বেশিরভাগ মানুষ বৃদ্ধাশ্রমে যেতে চান না। অস্ট্রেলিয়া প্রবীণদের নিজ বাড়িতে থাকার জন্য সহায়তা দেয়। যেমন—

  • গৃহপরিচর্যা * খাবার সরবরাহ * স্বাস্থ্যসেবা * চলাফেরায় সহায়তা বাংলাদেশেও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

২. প্রবীণদের অধিকারভিত্তিক আইন অস্ট্রেলিয়ায় প্রবীণদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পছন্দের অধিকার আইনি সুরক্ষা পায়। বাংলাদেশে প্রবীণদের নিয়ে কিছু আইন থাকলেও একটি পূর্ণাঙ্গ Older Persons Rights Act নেই। ভেরিফাই করিনি যদিও।

৩. জেরিয়াট্রিক (বয়স্ক) স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো মূলত সাধারণ চিকিৎসাকেন্দ্রিক। অথচ বয়স্কদের জন্য বিশেষায়িত সেবা প্রয়োজন। যেমন- ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার, পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ, ক্রনিক অসুস্থতা ম্যানেজমেন্ট।

৪. প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার তৈরি অস্ট্রেলিয়ায় এজড কেয়ার একটি স্বীকৃত পেশা। বাংলাদেশেও : * কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ * জেরিয়াট্রিক নার্সিং * সামাজিক কর্মী প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে, যা নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করবে।

৫. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা অনেক প্রবীণ একাকিত্বে ভোগেন। অস্ট্রেলিয়ায় সামাজিক অংশগ্রহণ, ক্লাব, ডে-কেয়ার এবং কমিউনিটি প্রোগ্রাম রয়েছে। বাংলাদেশে মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার, লাইব্রেরি ও স্থানীয় সংগঠনগুলোকে এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।

৬. তথ্যভিত্তিক নীতি অস্ট্রেলিয়া প্রবীণদের স্বাস্থ্য, আয়, আবাসন ও সেবার চাহিদা নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। বাংলাদেশেও জনসংখ্যার বার্ধক্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা ১. জাতীয় প্রবীণ নীতি আধুনিকায়ন ২. উপজেলা পর্যায়ে প্রবীণ সহায়তা কেন্দ্র ৩. বাড়িভিত্তিক সেবা কর্মসূচি ৪. প্রবীণ স্বাস্থ্যবিমা বা বিশেষ স্বাস্থ্যসুবিধা ৫. জেরিয়াট্রিক মেডিসিন ও কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ ৬. প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন ৭. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে সেবা সম্প্রসারণ।

বাংলাদেশ এখন যে অবস্থায় আছে, সেখানে অস্ট্রেলিয়ার মতো ব্যয়বহুল ব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করা কঠিন। তবে ‘বাড়িতে থেকে মর্যাদার সঙ্গে বার্ধক্য’ এবং ‘অধিকারভিত্তিক প্রবীণ সেবা’, এই দুটি ধারণা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা হতে পারে।

একটি মুসলিম দেশে, যেখানে আল্লাহ-রাসুলের কথা বলে আমরা কত কিছু জায়েজ করি, সে দেশে বাবা-মায়ের এই পরিণতি প্রচণ্ড যন্ত্রণার। পবিত্র কোরআনে বহুবার মা-বাবার অধিকার ও তাদের প্রতি সদাচরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৮টি সূরার ১৫টি আয়াতে এ বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনা রয়েছে।

সবশেষ ফখরুলকন্যা পোস্টে কোরআন শরীফের দুটি আয়াত উল্লেখ করেন।

সূরা আল-ইসরা (১৭:২৩-২৪)

তোমার পালনকর্তা আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে কথা বলো।

এবং তাদের প্রতি মমত্ববোধে বিনয়াবনত হয়ে তাদের জন্য দোয়া করতে থাকো: ‘হে আমার পালনকর্তা! তারা শৈশবে আমাকে যেভাবে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছেন, আপনিও তাদের প্রতি তেমনি রহম করুন।

ড. শামারুহ লিখেন, আল্লাহ আমাকে সাহায্য করুক আমার দায়িত্বে। আমেন।

প্রতিক্রিয়াবিএনপিমামিরপুররাজধানী