বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিবিধ

ভারতের নতুন রাজনৈতিক প্রজাতি: ‘তেলাপোকা’

কক্রোচ

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী নিজেদের ‘তেলাপোকা’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। শুনতে প্রথমে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে রয়েছে দেশটিতে বিরাজমান গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভ। একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন ভারতের তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক উপেক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জানা যায়, এ ঘটনার সূত্রপাত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য থেকে। ১৫ মে এক শুনানিতে তিনি বলেন, অনেক তরুণ ‘তেলাপোকার মতো’ বিভিন্ন পেশায় ঢুকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাকটিভিজমের মাধ্যমে সবাইকে আক্রমণ করছেন। তিনি মূলত ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহারকারীদের সমালোচনা করতে চাইলেও মন্তব্যটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বেকার তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়।

এরপরই ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপক নামের সাবেক এক রাজনৈতিক কৌশলবিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন—‘সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়?’ সেই পোস্ট থেকেই শুরু হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। কয়েক দিনের মধ্যেই দলটির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যায়। যদিও পরে ভারতের কর্তৃপক্ষ তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে, তবু নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে তারা আবার দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।

এই আন্দোলনের মূল শক্তি হলো ভারতের তরুণসমাজের হতাশা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ১০ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হার আরও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বারবার সরকারি চাকরির পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে বাতিল হওয়ায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা, পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে।

Advertisements

ককরোচ জনতা পার্টি এই হতাশাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করছে। তাদের ওয়েবসাইটে লেখা আছে—এটি ‘সেই মানুষদের রাজনৈতিক দল, যাদের হিসাব রাখতেই রাষ্ট্র ভুলে গেছে’। সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকে এবং অভিযোগ করতে পারেন—এমন ব্যক্তিরাই যোগ্য বিবেচিত হন। তবে হাস্যরসের আড়ালে তারা কিছু গুরুতর দাবিও তুলেছে। যেমন—রাজনীতিবিদদের দলবদলে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, সংসদে নারীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

ভারতের বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাও প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এটি আসলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মদদপুষ্ট একটি অনলাইন প্রচারণা। তবে অভিজিৎ দীপক দাবি করেছেন, এটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘তেলাপোকা’ শব্দটিকে অপমানের বদলে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করেছেন ভারতের তরুণেরা। তারা বোঝাতে চাইছেন—রাষ্ট্র যদি তাদের গুরুত্ব না দেয়, তবু তারা নীরব থাকবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এখন ভারতের তরুণ প্রজন্মের বঞ্চনা ও ক্ষোভের এক নতুন ভাষা হয়ে উঠেছে।

Advertisements
আন্দোলনককরোচ জনতা পার্টিতেলাপোকাভারতসিজেপি