বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
স্বাস্থ্য

দিন-রাত এসিতে থাকছেন? তবে সাবধান!

1715077389_new-project-2024-05-07t155223-094

গরম থেকে বাঁচতে এখন অনেকের দিন-রাত কাটছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। বাসা, অফিস, গাড়ি—সব জায়গাতেই যেন এসির ঠান্ডা হাওয়া ছাড়া চলেই না। কিন্তু আরামের এই অভ্যাস কি শরীরের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় এসির মধ্যে থাকলে শরীর ও মনের ওপর নানা ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কিছু সমস্যা সাময়িক হলেও, কিছু ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

১. ত্বক ও শরীর শুষ্ক হয়ে যেতে পারে


এসি রুমের বাতাস সাধারণত অনেক বেশি শুষ্ক হয়। দীর্ঘ সময় এই পরিবেশে থাকলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যায়। ফলে ঠোঁট ফাটা, ত্বক খসখসে হয়ে যাওয়া, চোখে জ্বালাপোড়া বা গলা শুকিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যাঁদের আগে থেকেই একজিমা বা অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।


২. মাথাব্যথা ও ক্লান্তি বাড়তে পারে

অনেকেই এসি রুমে দীর্ঘক্ষণ থাকার পর মাথা ভার লাগা, ঝিমুনি বা অস্বস্তি অনুভব করেন। কারণ, অনেক সময় ঘরের বাতাস ঠিকভাবে চলাচল করে না। একই বাতাস বারবার ঘুরতে থাকলে অক্সিজেনের মান কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে মাথাব্যথা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং অকারণে ক্লান্ত লাগার প্রবণতা বাড়তে পারে।


৩. ঠান্ডাজনিত সমস্যা বাড়তে পারে

সারাক্ষণ ঠান্ডা পরিবেশে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। এতে হাঁচি, কাশি, নাক বন্ধ, গলা ব্যথা বা সাইনাসের সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যারা ঘাম ঝরানো গরম পরিবেশ থেকে হঠাৎ খুব ঠান্ডা রুমে প্রবেশ করেন, তাঁদের শরীর দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারায় সমস্যা বেশি হয়।


৪. পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে

অনেকেই অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় এসির নিচে বসে থাকলে ঘাড়, কোমর বা হাঁটুতে ব্যথা বাড়ে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশে পেশি শক্ত হয়ে যেতে পারে, রক্ত চলাচল কিছুটা ধীর হয়। ফলে শরীরে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে বাত বা আর্থ্রাইটিসে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।


৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে

অতিরিক্ত ঠান্ডা ও শুষ্ক পরিবেশ শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। ফলে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সহজে হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনেক সময় এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। এতে ধুলাবালি, ছত্রাক বা জীবাণু জমে বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।


৬. মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় বন্ধ কক্ষে থাকা মানুষের মধ্যে অবসাদ, অস্থিরতা বা বিরক্তিভাব বাড়াতে পারে। প্রাকৃতিক আলো ও খোলা বাতাসের অভাব মানসিক সতেজতাকেও কমিয়ে দেয়। যাঁরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিস ও বাসা-দুই জায়গাতেই এসিতে থাকেন, তাঁদের মধ্যে অনেক সময় ‘ইনডোর ফ্যাটিগ’ বা ঘরবন্দি ক্লান্তি দেখা যায়।


৭. বাইরে বের হলেই শরীর ধাক্কা খেতে পারে

এসি রুম থেকে হঠাৎ তীব্র গরমে বের হলে শরীরের ওপর চাপ পড়ে। ঘন ঘন তাপমাত্রার পরিবর্তনে অনেকের মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা বা হিট স্ট্রেস হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের শরীর এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারে না।


তাহলে কি এসি ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে?

একেবারেই না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা এসিতে নয়- বরং এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এসি গরমজনিত অসুস্থতা থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে।

এসি ব্যবহার করার সময় যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি-

  • তাপমাত্রা ২৪–২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখুন
  • একটানা অনেকক্ষণ এসিতে না থেকে মাঝে মাঝে বাইরে হাঁটুন
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন
  • ঘরের বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন
  • এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করুন
  • সরাসরি ঠান্ডা বাতাস শরীরে লাগতে দেবেন না
  • শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঠান্ডা এড়িয়ে চলুন

আরাম হোক, কিন্তু সচেতনতাও থাক

এসি এখন বিলাসিতা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন। তবে শরীরেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সারাক্ষণ কৃত্রিম ঠান্ডার মধ্যে থাকলে শরীর ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক অভিযোজন ক্ষমতা হারাতে পারে। তাই আরামের পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতন ব্যবহারও। গরম থেকে বাঁচতে এসি ব্যবহার করুন, কিন্তু শরীরকে যেন ‘ঠান্ডার খাঁচায়’ বন্দি করে না ফেলেন।

এসিসচেতনতাসাবধান