বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৭ মে, ২০২৬
স্বাস্থ্য

উচ্চ রক্তচাপে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

devision-stage-BloodPressure_1_1440x1100-nci-d01ddd388916d861e33125a2679853f3

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি ‘নীরব ঘাতক’। দেশে নীরবে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা, অন্ধত্বসহ নানা অসংক্রামক রোগের পেছনে উচ্চ রক্তচাপ বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আক্রান্তদের বড় একটি অংশ জানেই না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। এ পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘উচ্চ রক্তচাপ মোকাবিলায় এককভাবে নয়, সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

দেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপ, বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, ধূমপান, মানসিক চাপ, ডায়াবেটিস ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে সবার জন্য বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত হলে উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগ ও মৃত্যুহার কমবে।’ গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি হৃদযন্ত্রের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক, কিডনি বিকল, চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মতো জটিলতাও তৈরি হয়।

ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের বড় অংশেরই উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। হৃদরোগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ একটি বড় সহায়ক ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে এবং ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যেও রক্তচাপজনিত জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ মোকাবিলায় তৃণমূল পর্যায়ে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য টেকসই অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা। পাশাপাশি লবণ কম খাওয়া, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, প্রতিদিন হাঁটা বা ব্যায়াম, ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ জরুরি। কিন্তু অনেক মানুষ জানেনই না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ নিজেদের উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে অবগত নন।

উত্তরাঞ্চলে এ হার আরও বেশি বলে জানা গেছে। দেশে উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সরকারি হাসপাতালের এনসিডি (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ) কর্নারগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার আশায় হাসপাতালে আসা প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের রোগীদের অনেকেই এক মাসের জায়গায় ১০ দিনের ওষুধ নিয়ে ফিরছেন। একটা ওষুধ পাচ্ছেন তো আরেকটা পাচ্ছেন না। ফলে নিয়মিত ওষুধ সেবনে ব্যাঘাত ঘটছে এবং বাড়ছে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি।

এ ব্যাপারে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এ কার্যক্রম ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও অধিকাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই। এতে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। ব্যক্তি সচেতনতা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, সহজলভ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে আগামীতে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের বোঝা আরও বাড়বে।

উচ্চ রক্তচাপবিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসমৃত্যুঝুঁকি