Skip to content

১১ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মিজান গাছি ও অপূর্ণ জীবন বৃত্ত

মাঘের সকাল, এখনো সূর্য ওঠেনি। ঘন কুয়াশা ঝুলে আছে ফসলের মাঠে, গ্রামের ঘর-দোর গাছগাছালির মাথায় দূরে দৃষ্টি চলে না । ক্ষেতের আলে, পথের ধারে, বাড়ির আশেপাশে সারি সারি খেজুর গাছ। ছোট-বড় সব গাছে মাটির হাঁড়ি ঝুলছে। এই গ্রামে বেশ ক’ঘর গাছিদের বাস। শীত মৌসুমে গাছ প্রস্তুত করা রস সংগ্রহ আর খেজুর গুড় বানানো এদের পেশা ও জীবিকা। নিজেদের তেমন জমিজমা নাই, অন্য মানুষের গাছ প্রতি চুক্তিতে রস লাগায়। আশপাশের গ্রাম গুলোতেও রসের হাঁড়ি লাগানোর ডাক পড়ে। গাছের শক্ত কাঁটা ডগা কেটে, বাকল চেঁচে রস বের করা বেশ কঠিন পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু গাছিরা অনায়াস দক্ষতায় সুনিপুণ ভাবে কাজটা করে।

মিজানের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে, হাড় জিরজিরে মেদহীন শরীর।নিরলস পাকানো পেশি, ঘাত-প্রতিঘাতে এখন ন্যুব্জ। খাটুনি আর অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই গ্রামের সে একজন নিপুণ দক্ষ গাছি। এই বয়সেও অবলীলায় গাছে চড়া, ধারালো দাউলির সাহায্যে রস বের করায় পারদর্শী সে। বছর বছর গাছ প্রতি চুক্তিতে কাজ করে, তার মতো আরও অনেকেই আছে এই গ্রামে। ইদানীং মিজান বীতশ্রদ্ধ, চারিদিকে অরাজক পরিস্থিতি তার ভালো লাগে না। পুরাতন দিনের অনেক গাছি মারা গেছে। তাদের উত্তরসূরিরা নীতি আদর্শের ধারধারে না। যথেচ্ছাচার চলছে ব্যবসায়,অনেকেই অসদুপায়ে বিত্তশালী।

অসুস্থ জমিরন এখনো ঘুমাচ্ছে,সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি তার ওপর হাপানির টান। প্রতি বছর শীতের সময় রোগ বাড়ে। তার রোগক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে মিজানের বুকটা মুচড়ে উঠলো। পুরনো কম্বলটা গায়ের ওপর টেনে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে পুবের বাতাস ভেতরটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ছেঁড়া চাদরটা গায়ে জড়িয়ে রস পাড়তে বেরিয়ে পড়লো সে। এ-বছর রসের পরিমাণ বেশ কম, আগের মতো নেই।

প্রকৃতির মতো মানুষের স্বভাবেও এখন অনেক পরিবর্তন। অসাধু প্রবণতা মিজানকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে, অন্যদের মতো মানুষকে ঠকাতে সে পারে না। বউ আর সে সারাদিন যেটুকু খাঁটি রসের পাটালিগুড় বানায় সেটা হাটে বেচে কষ্টেসৃষ্টে কোনোমতে দিন চলে যায়। জিনিসপত্রের যে আগুন দাম, চালডাল লবণ তেল জোটাতেই পয়সায় টান পড়ে তার ওপর ওষুধ কেনা মুশকিল হয়ে যায়। এখন বুড়া-বুড়ি দুজনের সংসার, দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, একটা ছেলে সেও বিয়ে করে ঢাকা শহরে থাকে, রিকশা চালায়। বাপ দাদার পেশায় তার কোনো আগ্রহ নাই। এক-দুবার সে গ্রামে আসে, কদাচিৎ টাকা পাঠায়। মিজান কারও মুখাপেক্ষী হতে চায় না, এই বয়সে এখনো সে খেটে পয়সা রোজগার করে।

ঘোর ঘোর কুয়াশার ভেতর মিজান কোমরে দড়া বেঁধে গাছ থেকে সাদা ফেনা ভর্তি রসের হাঁড়ি নামিয়ে আনে,তার মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। কাঁচা রসের মিষ্টি গন্ধ নেশা ধরায়। আজ জমিরনের ঔষধ কিনতেই হবে।চোখের সামনে কষ্ট আর সয় না। দক্ষ হাতে আবার নতুন হাঁড়ি লাগিয়ে দিয়ে নেমে আসে। এভাবে সব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে। বাঁক ভর্তি রসের হাঁড়ি বয়ে, বাড়ি আনার পথে কুদ্দুসের সঙ্গে দেখা। আরও কিছু জোয়ান ছেলেরা আছে তার সঙ্গে, বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যাচ্ছে সব রস পাড়তে। সেদিনের ছেলেছোকরা মুরব্বিদের দেখে লাজশরম নাই!

মিজান চাচা আছেন কেমুন, ব্যবসাপাতি কেমুন চলতেছে?
এই চলতেছে কুনুরকম।
চাচা একখান কতা কবো, বলে পান খাওয়া কালো দাঁত বের করে বিচ্ছিরিভাবে হাসে।
কও শুনি।
এহন আপনে মুরুব্বি হয়ে গেছেন, চাচি অসুস্থ এসব খাটুনির কাম বাদ দেন, আমার সাথে কাজ করেন, শুধু গুড়ের কারিগর আর কোন কাম করা লাগবি না। ভালো টাকা দেবনে। চাচির চিকিৎসা, সংসার খরচ চালাতি পারবেন। বিষয়ডা ভাইবে দ্যাহেন।
মিজান কোনো কথারই জবাব দেয় না, হনহন করে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে।
কুদ্দুসের লোকজন খিকখিক করে হাসে, টিপ্পনী কাটে কটুকথায় মস্করা করতে করতে চলে যায়।

মিজান মনে মনে জ্বলে, মুখে কিছুই বলে না। না শোনার ভান করে, জানে এইসব কম বয়সি ছেলেরা ভেজাল দুনাম্বারি কারবার করে। এদের জন্য আগের দিনের ঐতিহ্য, সুনাম আর নাই। খেজুর গুড়ে চিনি মেশায় , রঙ, তেল, আর ক্যামিকেল দিয়ে কেজি কেজি গুড় বানায়, রস দেয় কম কিসব গন্ধ নাকি দেয় একদম খাটি গুড়ের ঘ্রাণ বেরহয়। শহরের মানুষ টাকা দিয়ে সেসব কিনে খায়।

মিজান বাড়ি এসে দেখে বউ উনুন ধরিয়েছে। তার পানসে ফোলা ফোলা মুখটা চোখে পড়ে। সারারাত শ্বাসকষ্টে ঘুমাতে পারেনি তবুও আটা মেখে রুটি বানাচ্ছে। মিজান গরম রুটি ঝোলা গুড়দিয়ে খেতে পছন্দ করে। বাঁক নামিয়ে সাবধানে রসভর্তি হাড়িগুলো উননের পাশে রেখে, চিন্তিত মুখে হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে। সেই ছোট বেলা বাবার কাছে গাছির কাজ শেখা, অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই কাজে। সাত পুরুষ এই গুড় বানানোর কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন কি তাকে এই অসাধু চক্রের গ্যাঁড়াকলে পড়ে, পৈতৃক ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে!তার মুখে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।

এই পেশা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেনি, কিন্তু ছাড়তেও পারেনি। পুরাতন দোচালা ছোট ছনের কুঁড়ে আর উঠানে বড় চুলা। লোহার মস্ত কড়াই সেই দাদার আমলের, কড়া ক্ষয়ে গেছে তবুও তাতেই রস জ্বালের কাজ করে জমিরন। মিজান অভ্যস্ত হাতে ঘুটে ঘুটে মসৃণ মোলায়েম গুড় তৈরি করে। তার স্বাদ গন্ধ আর মিষ্টতা গাঁয়ের সেরা।গুড়ের পরিমাণ কম কিন্তু বাজারে বেশ ভালো দামে বিক্রি করে, ভালো চাহিদা। ইদানীং মানুষ চকচকে জিনিসের প্রতি ঝুকেছে, ভালো জিনিসের কদর কমেছে।অসৎ কারবারির দৌরাত্ম্যে টেকা মুস্কিল।
কুদ্দুস যেন তার পেছনে আঠার মতো লেগে আছে। ব্যবসা করতে দেবে না, তাকে কারিগর রাখবে নিজের ব্যবসায়।

জমিরন বেদম কাশে বুকটা হাসফাস করে, অস্থিচর্মসার শরীর আর চলে না। ওষুধ ফুরিয়েছে, আজ হাটে গুড় বেঁচে তবেই ওষুধ কিনবে।
মিজানের ভাবনায় ছেদ পড়ে…
সে রস ছেকে কড়াইয়ে ঢেলে দেয়, বিমর্ষ হয়ে বলে, বউ গুড়ের ব্যবসা আর করতে পারবো না মনে হয়।
কী হইছে, বাপ-দাদার ব্যবসা ছাড়বা ক্যান?
ব্যবসা ছাইড়া কী করবা তুমি, ক্যামনে চলবো সব কিছু?
কুদ্দুসের কথা মনে করে সে বললো, অন্য কিছু করমু তবু অসাধু লোকের সাথে হাত মিলামু না।

জমিরন চুপ হয়ে যায়, কী বা করতে বলবে সে স্বামীকে! খেজুরের শুকনা ডগা জ্বালিয়ে রস জ্বাল দিতে থাকে। মিজান ঘনঘন রস নাড়ে, হাতা দিয়ে গাদ কেটে ফেলে দেয়। সাদা রস ক্রমশ সোনালি লাল হয়ে ওঠে। পাকা রসের মিষ্টি গন্ধে ওদের ছোট্ট উঠোন ভরে যায়। শক্ত হাতে সুন্দর মোলায়েম গুড় বানায়।তার মেদহীন পেশীবহুল হাত দ্রুত চলতে থাকে। এই শীত মৌসুমে এটাই তার শেষ কাজ…

আজই গাছ ছেড়ে দেবে, সিদ্ধান্ত নেয়। জমিরনকে সে কিছু বলে না, অযথা চিন্তা করবে। আজ মহাজনের সঙ্গে কথা বলবে, কিছু টাকা জমা দিয়ে ভাড়ায় পা-ভ্যান তুলবে। অনেক তো হলো গাছি জীবন, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মাঝবয়সে এসে দাঁড়ালো। গুড়ের কারবার আর না।

যে-পা দিয়ে গাছে উঠতো সেই পায়ে এখন ভ্যানের প্যাডেল, যে হাতে দাউলির আঘাতে গাছের শক্ত বাকল কেটে রস বের করতো আজ সেই হাতে ভ্যানের স্টিয়ারিং তুলে নেবে। সে সব ছাড়তে রাজি নিজের আদর্শ নীতি জলাঞ্জলি দেবে না। কষ্টের সঙ্গে আজীবন বসবাস কষ্টের সঙ্গেই সন্ধি…

সক্কাল সক্কাল মিজান বউকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে, বউ বাইরে আয়।
জমিরন বাইরে এসে উঠানে নতুন ভ্যান দেখে অবাক হয়, কার ভ্যান, কী নিয়া যাইবেন?
মিজান কিছু বলে না। শুধু হাসে!
বউ তুই খাবার বানা আমি আইতাছি।
সে মাথায় মাফলার পেঁচিয়ে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে যায়, জমিরন স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে, দেখে গাছি মিজানের অন্য রূপ। বাঁক, গাছ কাটা দাওলি, মাটির অনেকগুলো হাঁড়ি উঠানের কোণে অবহেলায় পড়ে থাকে। লোহার কড়াই বড় উনুন হয়তো আর কাজে লাগবে না…

কুদ্দুস গুড়ভর্তি বড় বড় কার্টুন প্যাকেট নিয়ে অনেকক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। অস্থিরভাবে সময় দেখছে। মোবাইলফোনে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে। কোনো ভ্যান রিকশা তার চোখে পড়ে না। গঞ্জে যাবে মহাজনের চালান নিয়ে। এত সকালে কোনো যানবাহন নাই। এদিকে ঢাকার ট্রেনের টাইম হয়ে এলো। তাড়াতাড়ি যেতে না পারলে ট্রেন ফেল চালান বাতিল। অনেক লস হবে ভেবে, বিরক্তিতে তার ভ্রূ কুচকে ওঠে।

ঐ তো… কুদ্দুস ভ্যান দেখেই হেঁকে উঠলো, এদিকে আসেন। একি, মিজান চাচা আপনি!
শেষ পর্যন্ত ভ্যান চালাইবেন! আমি তো চাইছিলাম আপনেরে গুড়ের কারিগর হিসাবে রাখতে, অনেক বেশি টাকা দিতাম।
হ, কইছিলা, কিন্তুক আমি করমু না, ডাকতাছো ক্যান?
ভাড়া যাইবেন? গঞ্জে পাঁচমন গুড় নিয়া যামু।
না না আমি যামু না অন্য ভ্যান দেখো।
বেশি টাকা দিমুনে চলেন চাচা…
তাড়াতাড়ি যাওয়া লাগবো ঢাকা যাইবো গুড়।
মিজান নির্বিকার উত্তর দেয়, যামু না, কইছি না! ডবল ভাড়া দিলেও যামু না।
ঠিক সেই সময় পাশের গ্রামের মোমেন এসে দাঁড়ালো, চাচা, আব্বা খুব অসুস্থ হাসপাতালে নিতে হবে খুব জরুরি। আমাদের বাড়িতে চলেন।
মিজান কোনো দ্বিরুক্তি না করে মোমিনকে ভ্যানে উঠে বসতে বললো। সে ভাড়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করলো না।
কুদ্দুসের বেশি টাকার প্রলোভন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তার চোখের সামনে দিয়ে দ্রুত ভ্যান চালিয়ে চলে গেলো।
কুদ্দুসের ক্রুর দৃষ্টি, যত দূর মিজানকে দেখা যায় দগ্ধ করতে লাগলো।
পথের দুধারে খেজুর গাছের সারি, তার ভিতর দিয়ে গ্রামের সরু পাথর ঢালা রাস্তা , মিজানের শক্ত পায়ে প্যাডেল ঘুরছে! ভ্যান ছুটে চলেছে…স্বর্গীয় প্রশান্তির একটুকরো হাসি তার শীর্ণ মুখে।

অনন্যা/এসএএস