বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

ধোঁয়ার গ্রাম বোমাংখিল: তামাকের লাভে হারাচ্ছে মানুষ, বন আর ভবিষ্যৎ

WhatsApp Image 2026-05-14 at 6.34.24 PM

কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বোমাংখিল গ্রামে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়ে সবুজ তামাকখেত। দূর থেকে দৃশ্যটি শান্ত মনে হলেও একটু ভেতরে গেলেই বদলে যায় বাস্তবতা। বাতাসে ভেসে আসে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, চোখ জ্বালা করে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের আকাশ ঢেকে যায় ধোঁয়ার আস্তরণে। মনে হয়, পুরো গ্রাম যেন ধীরে ধীরে আগুনে পুড়ছে।

কয়েক বছর আগেও এই গ্রামের মানুষ ধান, মরিচ, শাকসবজি চাষ করতেন। এখন সেই জমিগুলো প্রায় পুরোপুরি তামাকের দখলে। কৃষকেরা বলছেন, অন্য ফসলে লোকসান হলেও তামাকে নিশ্চিত লাভ আছে। আর সেই লাভের টানেই বদলে গেছে গ্রামের চেহারা, বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপনও।

গ্রামের দক্ষিণ পাশে কৃষক মনির আহমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে তৈরি করা চুল্লিতে পোড়ানো হচ্ছে তামাকপাতা। পাশে স্তূপ করে রাখা বন থেকে আনা জ্বালানি কাঠ। কয়েকজন নারী ও শিশু সবুজ পাতা বেঁধে চুল্লিতে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ধোঁয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে করতে তাদের চোখ লাল হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে কাশি দিচ্ছেন কেউ কেউ, কিন্তু কাজ থামছে না।

সেখানে কাজ করা রহিমা বেগম বলেন, প্রতিদিন তামাক পোড়ানোর কাজ করে তিনি ৫০০ টাকা মজুরি পান। তবে এই আয়ের বিনিময়ে শরীরে নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “তামাকের রস হাতে লাগলে চামড়া উঠে যায়, সারা শরীর চুলকায়। কাশি-সর্দি তো লেগেই আছে। কিন্তু অন্য কাজ না থাকায় এই কাজই করতে হচ্ছে।”

Advertisements

মনির আহমদ জানান, তিনি চলতি মৌসুমে দুই একর জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তাঁর হিসাবে, এক একর জমির তামাকপাতা শুকাতে প্রায় ১২০ মণ কাঠ লাগে। এই কাঠ স্থানীয় বনাঞ্চল থেকেই আসে। তিনি নিজে কাঠ কাটেন না দাবি করলেও স্বীকার করেন, লোকজন বন থেকে সংগ্রহ করে চুল্লিতে এনে দেয়। কয়েক বছর আগেও তিনি ধান ও সবজি চাষ করতেন। কিন্তু সেসব চাষে খরচ উঠে না আসায় এখন তামাকেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

শুধু মনির আহমদ নন, গ্রামের আরও অনেক কৃষক একই পথে হাঁটছেন। সাকের আহমদ ও সাইফুল ইসলাম পাঁচ একর জমিতে তামাক চাষ করছেন। তাঁদের বাড়িতেও রয়েছে পৃথক চুল্লি। তাঁরা জানান, তামাক চাষে কোম্পানিগুলো আগাম চারা, কীটনাশক ও নগদ সহায়তা দেয়। ফলে কৃষকের ঝুঁকি কমে যায়। ফসল বিক্রির নিশ্চয়তাও থাকে। এই সুবিধার কারণেই এলাকার মানুষ দ্রুত তামাক চাষে ঝুঁকছেন।

কিন্তু এই লাভের আড়ালে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় এখন প্রায় ১৩ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। তামাকপাতা পোড়ানোর জন্য স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ চুল্লি। এসব চুল্লির প্রায় সবগুলোতেই ব্যবহার হচ্ছে বনাঞ্চলের কাঠ।

হিসাব বলছে, এক একর জমির তামাকপাতা শুকাতে গড়ে ১৩০ মণ কাঠ প্রয়োজন হয়। সে অনুযায়ী, পুরো অঞ্চলে প্রতিবছর লাখ লাখ মণ কাঠ পুড়ছে। এতে উজাড় হচ্ছে বন, কমছে পাহাড়ি এলাকার সবুজ আচ্ছাদন। বননির্ভর জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে।

শুধু বন নয়, দূষিত হচ্ছে নদী-খালও। চুল্লি থেকে বের হওয়া তলানি ও তামাকের বিষাক্ত রস গিয়ে মিশছে মাতামুহুরী, বাঁকখালীসহ বিভিন্ন নদী ও খালে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না, পানির স্বাভাবিক রংও বদলে যাচ্ছে।

বোমাংখিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, তামাক চাষের প্রভাব এখন শিক্ষাঙ্গনেও পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের সঙ্গে চুল্লিতে কাজ করতে যায়। ফলে স্কুলে উপস্থিতি কমছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বড় অংশ মৌসুমি শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও ধোঁয়ার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। বিকেলের দিকে স্কুলের আশপাশে এত ধোঁয়া থাকে যে ক্লাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”

স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও উদ্বেগজনক। চিকিৎসকেরা বলছেন, তামাকের ধোঁয়ায় দীর্ঘ সময় থাকলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের সংক্রমণ, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন নারী ও শিশুরা, কারণ চুল্লিতে পাতা শুকানোর কাজে তাদের অংশগ্রহণ বেশি।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিশুরোগবিশেষজ্ঞ ডা. নুরুল আলম বলেন, তামাকের ধোঁয়ায় থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের শ্বাসযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। পাশাপাশি তামাকের বর্জ্য পানিতে মিশে জলজ প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষে সহায়তা না দিলে এই পরিস্থিতি বদলানো কঠিন হবে। কারণ দরিদ্র কৃষকের কাছে লাভই বড় বাস্তবতা। যখন ধান বা সবজিতে লোকসান হয়, তখন তামাকই তাদের কাছে নিরাপদ পথ বলে মনে হয়।

অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তামাকপাতা পোড়ানোর এসব চুল্লির জন্য কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তবে বাস্তবে বছরের পর বছর চুল্লি চালু থাকলেও কার্যকর নজরদারি বা অভিযান খুব একটা দেখা যায় না।

পশ্চিম বোমাংখিল গ্রামের সন্ধ্যা নেমে আসে ধোঁয়ার চাদর মেলে। চুল্লির আগুন জ্বলতেই থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। সেই আগুনে শুধু তামাকপাতাই শুকায় না, ধীরে ধীরে পুড়ে যায় গ্রামের স্বাভাবিক জীবন, শিশুদের ভবিষ্যৎ আর আশপাশের প্রকৃতিও।

Advertisements
কক্সবাজারতামাকবোমাংখিলস্বাস্থ্যঝুঁকি