তবে কি পুষ্টির ঘাটতিই বিষণ্ণতার নীরব কারণ?
ডিপ্রেশন কিংবা বিষণ্ণতা- শব্দটির সাথে কম-বেশি সবাই পরিচিত। বরং অহরহ আমরা এই শব্দগুলো ব্যবহার করে থাকি। প্রায় অধিকাংশ মানুষই ভেবে থাকেন যে বিষণ্ণতার পে...
ডিপ্রেশন কিংবা বিষণ্ণতা- শব্দটির সাথে কম-বেশি সবাই পরিচিত। বরং অহরহ আমরা এই শব্দগুলো ব্যবহার করে থাকি। প্রায় অধিকাংশ মানুষই ভেবে থাকেন যে বিষণ্ণতার পেছনে মূল কারণ মানসিক চাপ অথবা অতিরিক্ত চিন্তা। কিন্তু বিষণ্ণতার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আছে পুষ্টির। পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবেও মানুষ বিষণ্ণ হতে পারে। চলুন জেনে নেয়া যাক এই সম্পর্কে।
বিষণ্নতা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা, যার তীব্রতা হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে। এ অবস্থায় জীবনের প্রতি আগ্রহ কমে যায়, আনন্দ অনুভব করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেকের কাজের উৎসাহও হারিয়ে যায়। কারও কারও মধ্যে আবার আত্মক্ষতির চিন্তাও দেখা দিতে পারে।

অনেকে বিষণ্ণতাকে সাময়িক মন খারাপ বা অবসাদ ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলতে থাকলে তা স্বাভাবিক জীবনযাপন, সম্পর্ক ও কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই বিষণ্ণতার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। চিকিৎসা ও ওষুধ বিষণ্ণতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে শরীরে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শুধু মানসিক নয়, খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত ভিটামিন ও খনিজ থাকছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৫ সালে জার্নাল অব সাইকোফার্মাকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় বিষণ্নতা ও ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতির মধ্যে সম্পর্ক আছে বলে ধারণা পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, রক্তে বি-১২ এর মাত্রা কমে গেলে বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তারা জানান, ভিটামিন বি-১২ মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মতো মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এটি পুরোপুরি নিশ্চিত ভাবে বলা যায়না তবু বিশেষজ্ঞরা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পুষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। পুষ্টির ক্ষেত্রে ভিটামিন বি-১২ এর পাশাপাশি ভিটামিন ডি, ওমেগা-৩, প্রোটিন, সেলেনিয়াম এবং আয়োডিনও গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন বি-১২
মুরগির মাংস, মাছ, ডিম ও দুধজাত খাবার ভিটামিন বি–১২ এর ভালো উৎস। নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসে অনেক সময় এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে কারণ উদ্ভিদজাত খাবারে এই ভিটামিন প্রায় থাকে না বললেই চলে।
সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রায় ২.৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি–১২ প্রয়োজন। গর্ভবতীদের জন্য এ চাহিদা ২.৬ মাইক্রোগ্রাম এবং স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য ২.৮ মাইক্রোগ্রাম। এছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি বা যাঁদের হজমজনিত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের শরীর খাবার থেকে পর্যাপ্ত বি–১২ শোষণ করতে পারে না, সেক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
ওমেগা-৩ ফ্যাট
দেহের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাট হলো ওমেগা-৩। ওমেগা-৩-এর সেরা উৎস হলো চর্বিযুক্ত বিভিন্ন ধরনের মাছ, তিসির বীজ, চিয়া বীজ, আখরোট, ডিম ইত্যাদি। এটি অবশ্যই খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে যেহেতু মানুষের শরীর নিজে থেকে ওমেগা-৩ ফ্যাট তৈরি করতে পারে না। মস্তিষ্ক ভালোভাবে কাজ করার জন্য এটি খুবই প্রয়োজন। যারা খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাট গ্রহণ করে থাকেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ কম দেখা যায়।

ভিটামিন ডি
ভিটামিন ডি ‘সূর্যালোক ভিটামিন’ নামে পরিচিত। সূর্যের আলোর সংস্পর্শে এলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই এই ভিটামিন তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন ডির ঘাটতি অনেক সময় মন খারাপ, ক্লান্তি ও হালকা বিষণ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শীতকালে সূর্যালোক কম পাওয়ার কারণে অনেকের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট বিষণ্ণতার কিছু উপসর্গ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তাই প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় সকালের রোদে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া হয়।
খাদ্যতালিকায় সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ ও মাশরুম রাখা ভালো। তবে যারা এসব খাবার কম খান বা এমন পরিবেশে থাকেন যেখানে সূর্যের আলো কম পৌঁছায়, তাঁদের মধ্যে ভিটামিন ডির ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি বেশি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রোটিন
প্রোটিনযুক্ত খাবার অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। মানব শরীর এগুলো ব্যবহার করে নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করে। এই নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর মধ্যে কিছু মানুষের সুখ এবং ভালো থাকার অনুভূতিতে ভূমিকা রাখে। সেরোটোনিন ও ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার তৈরির জন্য টাইরোসিন এবং ট্রিপটোফেন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড প্রয়োজন। এগুলো ছাড়া আপনার মন খারাপ ও বিষণ্ন অনুভব হতে পারে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ছাড়াও কিনোয়া এবং সয়া থেকে এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এ ছাড়া বাদাম, বীজ, শিম, শস্যদানায়ও কিছু পরিমাণে অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায়।
সেলেনিয়াম ও আয়োডিন
থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেলেনিয়াম ও আয়োডিন। থাইরয়েড ঠিকমতো কাজ না করলে, অর্থাৎ হাইপোথাইরয়েডিজম হলে, শরীরে ক্লান্তি, মনমরা ভাব ও হালকা থেকে মাঝারি বিষণ্ণতার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এ কারণটি উপেক্ষিত থেকে যায়। থাইরয়েড শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, তাই এর ভারসাম্য নষ্ট হলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। পর্যাপ্ত সেলেনিয়াম ও আয়োডিন পেতে সামুদ্রিক মাছ উপকারী, কারণ এতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে, যা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
তবে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র খাদ্য নয়, রক্ত পরীক্ষা করে পুষ্টির ঘাটতি নির্ণয় করা জরুরি। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।


