আন্টিসমাজ- মধ্যবয়সী নারীদের অদৃশ্য সাপোর্ট সিস্টেম
সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পরে শহরে বা মফস্বলের পড়ন্ত বিকেলবেলায় দেখা যায় পার্কে কিংবা বাসার ছাদে একদল নারী। তাদের কেউ কেউ গৃহিণী, কেউ কর্মজীবি কারো বা...

সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পরে শহরে বা মফস্বলের পড়ন্ত বিকেলবেলায় দেখা যায় পার্কে কিংবা বাসার ছাদে একদল নারী। তাদের কেউ কেউ গৃহিণী, কেউ কর্মজীবি কারো বা সন্তান বিদেশে। অনেক অফিস ফেরত কর্মজীবী নারীরা আবার সন্ধ্যার একটু পর নিজেদের বাসাতেই সেরে নেন সাপ্তাহিক আড্ডা। বাসা আর অফিস সামলে নানা কাজের ফাঁকে এসব আড্ডায়ই তারা খুঁজে নেন সমমনা মানুষের সঙ্গ। হাসি-কান্না-কোলাহলে ভাগ করে নেন নিজেদের সুখ দুঃখের কথা। তাদেরকে কাছের জনরা সকলেই চেনে ‘আন্টিসমাজ’ হিসেবে।
এই আন্টিসমাজ অনেকের চোখে ঠাট্টার বিষয়, অনেকের কাছে তারা সামাজিক প্রতিযোগিতা প্রথার ধারক ও বাহক। কিন্তু কিশোর-তরুণের চোখ দিয়ে নয়, বরং নিরপেক্ষভাবে দেখলে বোঝা যায়, পরিবারের মধ্যবয়সী নারীদের জন্য এটাই একমাত্র সাপোর্ট সিস্টেম।
নিঃসঙ্গতার প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে মধ্যবয়সী নারীদের জীবনে এক ধরনের অদৃশ্য নিঃসঙ্গতা কাজ করে। সন্তানরা বড় হয়ে পড়াশোনা, বিয়ে বা চাকরির কারণে দূরে চলে যায়, স্বামী ব্যস্ত থাকেন নিজের জগতে, আর পরিবারের কর্ত্রীর নিজস্ব গণ্ডি হয়ে পড়ে একাকী। সমাজের চোখে তিনি ‘নিরাপদ’, কিন্তু নিজের মনের কথা খুলে বলতে না পেরে তিনি প্রায়ই ভোগেন একাকীত্বে।
বিয়ে পরবর্তী দায়িত্বের জোয়ারে কখনও স্ত্রী, কখনও ঘরের কর্ত্রী, কিংবা মা এর দায়িত্ব সামলে উঠতে উঠতে একসময় স্বপ্নে বিভোর তরুণীর চোখ দুটোতে কতটুকু ক্লান্তি ভর করে, তা শোনার মতো, জিজ্ঞেস করার মতো সময় বা ইচ্ছা, কোনোটাই কারোর থাকে না। তখন তার ব্যক্ত-অব্যক্ত কথাগুলোকে বুঝতে পারে কেবল তার মতোই আরেকজন মধ্যবয়সী নারী।
বন্ধুত্বের অব্যক্ত থেরাপি
নারীদের নিজস্ব এই মিলনমেলা অনেকের চোখে স্রেফ ‘কিটি পার্টি’ কিংবা ‘গসিপ সেন্টার’ হলেও এই নিয়মিত আড্ডাগুলোতেই তারা হয়ে ওঠেন পরস্পরের সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয়।
কফির কাপে গল্প, ফেসবুক গ্রুপে আলোচনা, কিংবা একসঙ্গে মুভি দেখতে যাওয়া, সব মিলিয়ে যেন নৈমিত্তিক রুটিনের বাইরে কিছু সময়ের জন্য তারা আবার সেই কিশোরী বা তরুণীবেলায় ফেরত যান, যখন তাদের জীবন ছিল বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাস, আড্ডা, শপিংয়ে ঘুরে পার করা। এসব আড্ডায় নিজেদের মিলে যাওয়া সমস্যাগুলো শেয়ার করে যেমন মনের ভার হালকা করতে পারেন, তেমনি সমস্যা আর দায়িত্বের বাইরের জীবনটাকেও নিজেদের মতো উপভোগ করার সুযোগ পান।
কেন দরকার এই সাপোর্ট সিস্টেম ?
আমাদের সমাজে যখন ‘নারী অধিকার’ নিয়ে কোনো সভা, সেমিনার আয়োজন করা হয়, তখন সেখানে কোনো মধ্যবয়সী গৃহিণী নারীকে কখনও রাখা হয় না। যেন এই নারীদের সমাজে কোন অবদান নেই, নেই কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন। অথচ সমাজে অরক্ষিত নারীদের একটা বড় অংশ তারা, যারা শুধু গৃহিণী হিসেবে জীবনযাপন করেন। ছোট খাটো সাংসারিক বিবাদ থেকে শুরু করে গুরুতর পারিবারিক সহিংসতা থেকে তাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য সর্বপ্রধান ভূমিকা পালন করে নারীটির পরিবার এবং তার কমিউনিটি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের চেয়েও আশপাশের কমিউনিটিই বরং পারিবারিক নির্যাতন নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
নারীদের ভার্চুয়াল কম্যুনিটি সাপোর্ট
নারীদের পারস্পারিক যোগাযোগের ধারণার ওপর ভিত্তি করে দক্ষিণ আফ্রিকার নারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে এআই চ্যাটবট। প্রতিদিন গড়ে সাতজন নারী পারিবারিক সহিংসতায় খুন হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকায় নারী নির্যাতন এতো প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, নৈমিত্তিক ভিত্তিতে অত্যাচারের প্রতিরোধ বাতলে দেয়ার মতো ভরসাযোগ্য মানুষ যেমন নেই, তেমনি এসব ঘটনার আধিক্যের ফলে নির্যাতনের স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে মারাত্মকভাবে।
এমন পরিস্থিতিতে কম্যুনিটির বাইরে থাকা তেরো হাজার নারীদের সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে গ্রিট (Grit) নামের এই অ্যাপটি। দক্ষিণ আফ্রিকার লিওনোরা টিমা নিজের পরিবারের ১৯ বছর বয়সী নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা আত্মীয়ার এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর তৈরি করেন এই প্ল্যাটফর্মটি। এই নৃশংস ঘটনার পর লিওনোরা সিদ্ধান্ত নেন এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করবেন, যেখানে নারীরা নিরাপদে কথা বলতে পারবেন এবং প্রমাণ সংরক্ষণ করতে পারবেন।
গ্রিট (Grit) আ্যাপে আছে নির্যাতন নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার মাধ্যমে আইনী পরামর্শ এবং মানসিক সহায়তা নেয়ার ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে কাজ করে এআই চ্যাটবট ‘জুজি’, দেখতে শুনতে যাকে ব্যবহারকারীরা পাশের বাসার ভাবি বা আন্টির মতো বিশ্বাস করতে পারেন। এছাড়া রয়েছে তাৎক্ষণিক বোতাম টিপে নির্যাতনের অডিও-ভিডিও ধারণ করার ব্যবস্থা। এজন্য অ্যাপে ‘ভল্ট’ নামের একটি নিরাপদ জায়গা রয়েছে, যেখানে ছবি, মেসেজ বা অডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করা যায়।
সমাজে অন্য মানুষরা বাংলাদেশের নারীদের কম্যুনিটিকে যে নামেই ডাকুন না কেন, এই নারীদের বিপদের সময় সাহায্য ও পরামর্শের পথ বাতলে দেয় এই প্রচলিত “ভাবিসমাজ” কিংবা ‘আন্টিসমাজ’ই। সমাজ তাদের এই বন্ধনকে হালকাভাবে নিলেও আন্টিসমাজ কিংবা ভাবীসমাজ আদতে এসব গ্রুপে নিজের মতো করে নতুন এক ‘কমিউনিটি’ খুঁজে পান। জীবনসঙ্গী পুরুষ কিংবা ছেলেমেয়েরা যখন নিজেদের জীবনে ব্যস্ত, তখন তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য এই কমিউনিটির অস্তিত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।


