অতিরিক্ত লবণ ঝুঁকিতে দেশের জনস্বাস্থ্য, বছরে ২৪ হাজার মৃত্যু
বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত খাবার যেমন চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ ও লবণযুক্ত বিস্কুটে অতিরিক্ত মাত্রায় লবণ রয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স...

বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত খাবার যেমন চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ ও লবণযুক্ত বিস্কুটে অতিরিক্ত মাত্রায় লবণ রয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
২০২৬ সালের ‘বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ’ উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসচেতনতামূলক সেমিনারে তারা জানান, একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি দৈনিক গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নিলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো অসংক্রামক রোগের (NCD) ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এটি রক্তচাপ বাড়ায় এবং হৃদরোগ, অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের সহকারী বিজ্ঞানী ড. আহমেদ খায়রুল আবরার জানান, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে, যার মধ্যে ৫১ শতাংশ অকালমৃত্যু।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্যাকেটজাত খাবারে ‘লুকানো লবণ’
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা ‘লুকানো লবণ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ ও বিস্কুটে প্রায়ই অতিরিক্ত লবণ থাকে।
এমনকি অনেক মিষ্টি স্বাদের খাবারেও অতিরিক্ত সোডিয়াম থাকতে পারে, যা অধিকাংশ ভোক্তার অজানা। ফলে মানুষ না জেনেই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লবণ গ্রহণ করছে।
সতর্কতামূলক লেবেল ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি
সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত খাবার শনাক্ত করতে প্যাকেটের সামনের অংশে বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেল, প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপাদান পুনর্গঠন (reformulation) এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা চালু করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাইদুল আরেফিন বলেন, দেশে প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্যাকেটজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মক্ষেত্রে কম লবণযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন।
অধ্যাপক সোহেল রেজা আবারও বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেল, প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপাদান পরিবর্তন এবং জোরালো জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে খাদ্যের মোড়কে সঠিক পুষ্টিগুণ সংক্রান্ত তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি জানান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।


