বাংলাদেশে সাইবার বুলিং-এর শিকার প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী
প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করে তুলেছে, ঠিক তেমনই দুর্বিষহ করে তুলেছে এর অপব্যবহার। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএন...

প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করে তুলেছে, ঠিক তেমনই দুর্বিষহ করে তুলেছে এর অপব্যবহার। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএর এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে সাইবার হয়রানির ক্রমবর্ধমান এক উদ্বেগজনক চিত্র। সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৮৯ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত মঙ্গলবার (১২ মে) ঢাকার এক সমীক্ষায় প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
সমীক্ষাটিতে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এতে আরও দেখা গেছে যে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্যের ভয়ে ঘটনার বিষয়ে কোনো অভিযোগই করেন না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) জানায়, প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে অনলাইন ব্ল্যাকমেল, পরিচয় চুরি, ছবি বিকৃতকরণ এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে।
বর্তমানে সাইবারস্টকিং, সাইবারবুলিং, ডক্সিং, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্য যেন অনলাইনে সাধারণ রূপে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ক্ষতিকর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়বস্তু অপসারণের জন্য কমিশন ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পেয়েছে যার পরিপ্রেক্ষিতে ১২ হাজারের বেশি কন্টেন্ট অপসারণ করা হয়েছে।
বিটিআরসির তথ্যমতে, অভিযোগকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী, যা নারী ব্যবহারকারীদের ওপর অনলাইন হয়রানির ক্রমবর্ধমান একটি চিত্র তুলে ধরে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পরিবারগুলোর মধ্যে অধিক সচেতনতার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিটিআরসি কর্মকর্তারা।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধ-সম্পর্কিত ঘটনায় ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী সহায়তা চেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪১ শতাংশ ডক্সিং-এর শিকার হয়েছেন, ১৮ শতাংশ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের অভিযোগ করেছেন, ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়েছেন ১৭ শতাংশ , ছদ্মবেশ ধারণের শিকার হয়েছেন ৯ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ সাইবারবুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রবণতাও বাড়ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন আহমেদ বলেন, ডক্সিংয়ের সবচেয়ে বেশি শিকার হন নারীরা যা প্রায় ৪৮ শতাংশ। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ডক্সিং হলো কোনো ব্যক্তিকে হুমকি বা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে তার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা। তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীরা পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন হটলাইন ০১৩২০০০৮৮৮, ভুক্তভোগীরা এর ফেসবুক পেজ ও ইমেইলের মাধ্যমেও সহায়তা চাইতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন সহিংসতা শুধু ডিজিটাল হয়রানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি ভুক্তভোগীদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ভুয়া অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে পরিচয় যাচাই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের সহায়তায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনি সহায়তার জন্য জাতীয় হটলাইন ১৬৬৯৯ এবং পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন হটলাইনে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।


