বাংলাদেশের নারী ও জীবনধারার ম্যাগাজিনরবিবার, ১০ মে, ২০২৬
নারী

চিত্রনায়িকা ববিতার সিঙ্গেল মাদার জার্নি

ব্যবসায়ী ইফতেখারুল আলমকে ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ে করেন অভিনয়শিল্পী ফরিদা আক্তার ববিতা। বিয়ের তিন বছরের মাথায়, ১৯৮৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সন্তান অনিক ই...

1753852739.bobita

ব্যবসায়ী ইফতেখারুল আলমকে ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ে করেন অভিনয়শিল্পী ফরিদা আক্তার ববিতা। বিয়ের তিন বছরের মাথায়, ১৯৮৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সন্তান অনিক ইসলামের জন্ম। অনিকের জন্মের তিন বছরের মাথায় মারা যান ববিতার স্বামী। এরপর থেকে তার জীবনে অনেকে আসতে চেয়েছিলেন। পরিবার আর আত্মীয়স্বজনও চাপ দিচ্ছিলেন বিয়ের জন্য। কিন্তু অনড় ববিতা সন্তানের কথা ভেবে দ্বিতীয়বার সংসারজীবন শুরু করেননি।

সিনেমা ঘিরে স্বপ্ন ছিল ববিতার। স্বামী ইফতেখারুল আলমও তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। বলেছিলেন, বাড়ির কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না তাকে, যেন শুধুই সিনেমা নিয়ে ভাবেন। তিনিও সেভাবেই জীবন পার করছিলেন।

স্বামী আর পেশাগত জীবন দুটিই সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু কে জানত, এত অল্প সময়ের সংসারজীবন হবে তার। ববিতার মতে, ‘মাত্র ছয় বছরের দাম্পত্য জীবন। হঠাৎ অনিকের বাবার মৃত্যুতে চারদিকে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। কী করব, কীভাবে জীবন চলবে, যেন দিশাহারা আমি। তবে মনোবল হারানোর মানুষ তো আমি নই। মনটাকে শক্ত করি। আমার সন্তান আছে, তাকে নিয়েই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। তাকে গড়ে তুলতে হবে। আবার আমার ক্যারিয়ার। দুটোকে সমন্বয় করেই এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করি।’

অনিকের বাবা ইফতেখারুল আলম নানা ধরনের রোগে ভুগছিলেন। কিডনি, লিভার, হার্টের নানান রোগ ছিল তার। তবে এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন, তা ভাবতে পারেননি ববিতা। মারা যাওয়ার পরের সময়টুকু তাই অকুলপাথারে পড়লেও সামলে নেন। ববিতা বললেন, ‘পরিবারের কেউ আমাকে সারা দিন দেখাশোনা করবে না। মাঝেমধ্যে করবে। কারণ, তাদের সবারও তো আলাদা সংসার, পেশাগত জীবন আছে। তাই সব আমাকে একাই করতে হতো। শুটিং, আয়রোজগার, সংসার চালানো, অনিককে দেখভাল—সব একাই করতে হতো।’

অনিকের জন্মের আগে ‘লেডি স্মাগলার’ নামে একটি ছবির শুটিংয়ে ফিলিপাইনে যান ববিতা। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের এই ছবির বেশির ভাগ শুটিং হয় ফিলিপাইনে। অ্যানি সি স্কোভা নামের এক তরুণী ফিলিপাইনে ছবিটির শুটিংয়ের প্রোডাকশনে কাজ করতেন। সেই মেয়েটিকে পছন্দ হয় ববিতার। তাকে দেশে আনার পরিকল্পনা করেন, যাতে বাসার কাজে সহযোগিতা পাওয়া যায়। একটা পর্যায়ে প্রস্তাবও দেন।

ফিলিপাইনের সেই তরুণী অনিকের জন্মের পর তার দেখভালও করেছেন। ববিতা বললেন, ‘ফিলিপাইনে ‘লেডি স্মাগলার’ ছবির শুটিংয়ের সময়ে অ্যানিকে বলেছিলাম, তুমি কি বাংলাদেশে যেতে চাও? তখন কিন্তু অনিকের জন্ম হয়নি। সে বলে কি, আমার তো পাসপোর্ট নেই। তখন বলেছিলাম, আমি পাসপোর্ট করিয়ে নেব। আমি ভাবলাম, আমি একজন শিল্পী মানুষ, শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এমন একজন মানুষ দরকার, যে খুব বিশ্বাসী। তখন বাংলাদেশি, কাজ যারা করত, তাদের ওপর খুব একটা আস্থা রাখা যেত না। নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত। আবার তারা ঠিকমতো কাজ করত না।

অ্যানিকে আনলাম, মেয়েটা এত বিশ্বাসী ছিল, আমার বাসার সবকিছু সামাল দিত। ঘরসংসার, বাজারসদাই, সব করত। আমার শুটিংয়ের কাজেও সহযোগিতা করত। শুরুতে টানা পাঁচ-ছয় বছর ছিল। এরপর একবার গিয়ে আবার এল। ফিরে এসে আবার পাঁচ-ছয় বছর ছিল। তারপর একদিন মেয়েটা বলল, বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে, আমাকে একেবারে চলে যেতে হবে। মেয়েটা চলে গেল। এরপর আবার অন্য মিশন শুরু।

ববিতার ছেলে অনিকের স্কুলজীবন শুরু বনানীর প্লে–পেন স্কুলে। ববিতা বললেন, ‘আমার ড্রাইভার অনিককে স্কুলে দিয়ে আসত। মেয়েটা নিয়ে আসত। ওই মেয়েটা আমি যখন ছবি বানাতাম প্রোডাকশনের কাজও করত। সব কাজ জানত। খুবই স্মার্ট ছিল। বাংলাদেশে তখন বাসাবাড়িতে বিদেশি কাজের লোক রাখা যেত না। আমি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছিলাম। লিখেছিলাম, আমি একজন শিল্পী মানুষ, দেশ-বিদেশ নানা জায়গায় শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। আমার সন্তানের বাবা বেঁচে নাই। আমার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে গৃহপরিচারিকা রাখার অনুমতি দিলে ভালো হয়। অনুমতি পাই।’

প্লে–পেন স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর অনিকের স্কুলজীবন শুরু স্কলাস্টিকায়। এখান থেকেই ও লেভেল আর এ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কানাডার ওয়াটার লু ইউনিভার্সিটিতে। কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। এখন চাকরি করছেন। ববিতা সেই সময়ের কথা মনে করে বললেন, ‘অনিক যখন বনানীর স্কুলে যাওয়া শুরু করে, তখন শুরুর দিকে আমি ওর ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। পরীক্ষায় সময় এটা বেশি করতে হতো। ববিতা নায়িকা, ওসব বিষয়ে আমার মধ্যে কাজ করত না।’

ফিলিপাইনের গৃহপরিচারিকা অ্যানি চলে যাওয়ার পর ববিতার আবার চিন্তায় পড়ে যান। শুটিং করতে হলে তো বাসাবাড়ির কাজের সহযোগিতার জন্য গৃহপরিচারিকা লাগবে। এবার অনেকটা বাধ্য হয়ে দেশ থেকে নিলেন। তবে বাইরে গেলে মনটা পড়ে থাকত বাসায়। অনিক কী করছে, খাচ্ছে তো ঠিকমতো। ঘুম হচ্ছে কি? পড়াশোনা করছে কি? এদিকে ববিতার স্বামীর মারা যাওয়ার একটা সময় পর তার ওপর বিয়ের চাপ আসতে থাকে। পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন সবারই একটা চাপ ছিল। অন্যদিকে স্বামী যেহেতু নেই, প্রেমের প্রস্তাবও বাদ যায়নি। অনেকেই তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন, বিয়ে করে সংসারী হতে চেয়েছেন। কিন্তু ববিতা ছেলে অনিকের কথা ভেবে বিয়ের কথা ভাবেননি।

ববিতা বললেন, ‘আত্মীয়স্বজন আর অভিভাবকেরা বলত, তুমি এত অল্প বয়সে স্বামীহারা হলে, আবার বিয়ে করা উচিত। কারণ, আমি সব মিলিয়ে সংসার করেছি পাঁচ-ছয় বছর। তারপর তো অনিকের বাবা মারাই গেল। আমি বললাম, বিয়ে আমি আর করব না। আমার সন্তান, আমার অভিনয়জীবন—এ নিয়েই আগামী জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। সন্তানের দেখভাল, শুটিং—একা জীবনে যতটুকু পারি করেছি। তবে ওই সময়টায় সিঙ্গেল মাদার হওয়ার কারণে অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে। আউটডোর শুটিং পারতপক্ষে করতে পারতাম না। নিতাম না। ভাবতাম, আমি যদি ঢাকায় না থাকি, তাহলে বাসায় যদি কোনো সমস্যা হয়, কীভাবে সামাল দেব।

এফডিসিতে থাকলে তো গাড়ি টান দিয়ে বাসায় যেতে পারব। কিন্তু কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, সিলেট, গাজীপুরে যদি শুটিংয়ে থাকি, তাহলে তো ছেলের খোঁজখবর নিতে পারব না। এরপরও কতবার যে এমন হয়েছে, আমি শুটিংয়ে যাওয়ার সময় অনিক খুব কাঁদছিল। বলছিল, ‘আম্মা তুমি যেয়ো না, আম্মা তুমি যেয়ো না। ‘কিন্তু ছবিগুলো তো আমার সাইন করা। যেতেই হবে। শুটিং না করলে সংসারজীবনই–বা চলবে কী করে। এসব নিয়ে আমার পুরো জীবনটা কেটেছে।’

সিঙ্গেল মাদার হিসেবে যে জীবন কাটিয়ে এসেছেন, তা নিয়ে ববিতা বললেন, ‘আমার জীবনটা অনেক কঠিন ছিল, আবার শান্তিরও। অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু সবকিছুর পর যখন সন্তানের মুখটা দেখতাম, শান্তিতে মনটা ভরে যেত।’
ছেলে অনিক যখন ও লেভেলের শিক্ষার্থী তখন তিনি মায়ের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেন। সেই সময়ের কথা মনে করে ববিতা বললেন, ‘অনিক যখন বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে, তখন আমাকে বলত, ‘আম্মা তুমি একা। তোমার অনেক কষ্ট হয়। তুমি একটা আব্বু নিয়ে আসো।’ আমি সন্তানকে বুঝিয়েছিলাম, ‘না বাবা, এটা হয় না। তুমি থাকলে আমার কিছুই লাগবে না। তোমাকে নিয়েই তো আমি ভালো আছি’।

কথা প্রসঙ্গে ববিতা আরও বললেন, ‘সবাই যে এত বলত বিয়ে করো, বিয়ে করো, তখন এটাও ভাবতাম, আমি যদি একটা মানুষকে বিয়ে করি, সেই সংসারে হয়তো সন্তান হবে। আর সন্তান যদি হয়, কেমন হবে, কী হবে? অনিককে মেনে নেবে কি নেবে না। অনিক আবার তাদের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে কি পারবে না, কত কি যে আমার মাথার মধ্যে চলত। কত মানুষ আমাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। চাইলে বিয়ে করতেই পারতাম, কিন্তু করিনি। আমাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন বিয়ে করেছে, সেটা একান্তই তাদের বিষয়। অনেক কিছু ভেবে আর দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা ভাবিনি।’

দেশে আর দেশের বাইরে—সবার কাছে ববিতা তাদের প্রিয় একজন অভিনেত্রী, কিন্তু একমাত্র ছেলে অনিকের কাছে শুধুই ‘সংগ্রামী মা’। তাই তো সংগ্রামী মায়ের স্বপ্নপূরণে ছেলে অনিক পড়াশোনা ছাড়া আর কিছুই ভাবতেন না। ববিতা দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ২৭৫টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। দেশের বিখ্যাত সব নির্মাতার পাশাপাশি কাজ করেছেন দেশের বাইরের বিখ্যাত নির্মাতার ছবিতেও। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবির জন্য ববিতা দেশে ও দেশের বাইরে প্রশংসা কুড়ান।

চিত্রনায়িকাববিতাসিঙ্গেল মাদার