বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

দুপুরের ভাতঘুমে কি সত্যিই ওজন বাড়ে ?

sleep

দুপুরের খাবারের পর একটু চোখ বুজে নেওয়া এক পরিচিত অভ্যাস। গ্রামবাংলা থেকে শহুরে ফ্ল্যাট- অনেকেই একে “ভাতঘুম” নামে চেনেন। কিন্তু এই ভাতঘুম কি নিছক অলসতার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে শরীরের প্রকৃত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন? আধুনিক গবেষণা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রথমেই আসা যাক শরীরবিজ্ঞানের কথায়। মানুষের দেহে একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি কাজ করে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই রিদম অনুযায়ী, দুপুরের দিকে- বিশেষ করে দুপুর ১টা থেকে ৩টার মধ্যে- আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ক্লান্তি অনুভব করে। এই সময়টিতে শক্তির মাত্রা কমে যায়, মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয় এবং ঘুম ঘুম ভাব আসে। অর্থাৎ, দুপুরের ভাতঘুম কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়; বরং এটি শরীরের স্বাভাবিক ছন্দেরই অংশ।

খাবারের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুপুরে আমরা সাধারণত ভাতসহ কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করি। এই ধরনের খাবার খাওয়ার পর শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ে, যা ট্রিপটোফ্যান নামক একটি অ্যামিনো অ্যাসিডকে মস্তিষ্কে প্রবেশে সহায়তা করে। এর ফলে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন বাড়ে, যা ঘুমের অনুভূতি সৃষ্টি করে। তাই ভাতঘুমের পেছনে কেবল অভ্যাস নয়, বরং জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়াও কাজ করে।

তবে প্রশ্ন হলো- এই ঘুম কি উপকারী?

গবেষণা বলছে, স্বল্প সময়ের দুপুরের ঘুম (১৫ থেকে ৩০ মিনিট) শরীর ও মনের জন্য বেশ উপকারী হতে পারে। এটি স্মৃতিশক্তি উন্নত করে, মনোযোগ বাড়ায়, মানসিক চাপ কমায় এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অনেক উন্নত দেশে “পাওয়ার ন্যাপ” এখন কর্মক্ষেত্রেও উৎসাহিত করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস কিছু সমস্যারও সৃষ্টি করতে পারে। এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ঘুমালে তা রাতের ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত ভাতঘুম শরীরকে আরও অলস করে তুলতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে ওজন বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের দিবানিদ্রা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ভাতঘুমের একটি আলাদা মাত্রা রয়েছে। গ্রামীণ জীবনে, যেখানে দিনের শুরু হয় খুব ভোরে এবং শারীরিক পরিশ্রম বেশি, সেখানে দুপুরের বিশ্রাম প্রয়োজনীয়। শহুরে জীবনে যদিও কর্মব্যস্ততা বেশি, তবুও অনেকেই সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনে ভাতঘুম উপভোগ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাতঘুমকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং সঠিকভাবে গ্রহণ করাই গুরুত্বপূর্ণ। দুপুরে যদি ঘুমাতেই হয়, তবে তা যেন ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ঘুমের সময়টিও ideally দুপুর ১টা থেকে ৩টার মধ্যে হওয়া উচিত। সন্ধ্যার পরে বা বিকেলের শেষভাগে ঘুমানো এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ এতে রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবনযাত্রার ভারসাম্য। যদি কেউ রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না পান, তবে দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে- যা একটি অসুস্থ রুটিনের ইঙ্গিত। তাই নিয়মিত ও পর্যাপ্ত রাতের ঘুম নিশ্চিত করাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, ভাতঘুমকে এক কথায় অলসতা বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক চাহিদা হতে পারে, যদি তা সঠিক মাত্রায় ও সময়ে গ্রহণ করা হয়। তবে এর অপব্যবহার করলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে। তাই সচেতনতা ও সংযমই হতে পারে ভাতঘুমের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।

ওজনদুপুরভাতঘুম