বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

স্যানিটারি প্যাডসহ পিরিয়ড পণ্য নিষিদ্ধ করল মিয়ানমার

68e14b409f98248c58d7d1d4db000b0b-69e65d0ff03fa

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা দেশজুড়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ পিরিয়ড পণ্যের বিতরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাদের দাবি, বিদ্রোহীরা এসব প্যাড আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসার কাজে এবং জুতার ভেতরে ঘাম ও রক্ত শোষণের জন্য ব্যবহার করছে।

২০২১ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মিয়ানমার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। গত কয়েক বছরে কামানের গোলাবর্ষণ, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তার- এসব দেশটির নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবে সামরিক জান্তা নতুন একটি কৌশল নিয়েছে, যার আওতায় বিভিন্ন স্থানে নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী ‘স্যানিটারি প্যাড’ সরবরাহ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি সরবরাহ সমস্যার বিষয় নয়; বরং এটি নারীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ‘লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’।

সামরিক বাহিনীর দাবি, জান্তাবিরোধী ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ (পিডিএফ)-এর যোদ্ধারা এসব প্যাড রণক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যবহার করছে। নারী অধিকার সংগঠন ‘সিস্টার্স টু সিস্টার্স’-এর পরিচালক থিনজার শুনলেই ই জানান, সামরিক বাহিনীর ভাষ্যমতে, যোদ্ধারা গুলির ক্ষত থেকে রক্তপাত বন্ধ করতে এবং বুটের ভেতরে ঘাম ও রক্ত শোষণে এগুলো ব্যবহার করে। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ‘স্কিলস ফর হিউম্যানিটি’ (এসএফএইচ)-এর প্রতিষ্ঠাতা মেরেডিথ বান বলেন, ‘যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা যার আছে, সে-ও জানে যে গুলির ক্ষত বা গভীর কাটাছেঁড়ায় স্যানিটারি প্যাড কোনো কাজেই আসে না।’ তিনি বলেন, প্যাড ক্ষতের ওপর স্থির থাকে না, অতিরিক্ত রক্ত শোষণ করতে পারে না এবং জীবাণুমুক্ত রাখতে পারে না। তাঁর মতে, এ সিদ্ধান্ত সামরিক বাহিনীর ‘অশিক্ষিত ও নারীবিদ্বেষী’ মানসিকতার প্রতিফলন।

মিয়ানমারের সমাজে ঋতুস্রাব নিয়ে দীর্ঘদিনের ট্যাবু রয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে। ‘প্যান কা লে’-এর প্রতিষ্ঠাতা হেনরিয়েট সিরাক বলেন, ‘এটি খুবই স্পষ্ট যে সামরিক বাহিনী নারীর চলাফেরাকে আরও বেশি সীমিত করতে চায়। এটি সম্পূর্ণভাবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা।’ অধিকারকর্মীদের মতে, ঋতুস্রাবের সময় নারীদের ঘরে সীমাবদ্ধ রাখলে তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রতিরোধ থেকে দূরে থাকবে—এমন হিসাব থেকেই এ পদক্ষেপ।

স্যানিটারি প্যাডের সংকটে নারীরা ছেঁড়া কাপড়, গাছের পাতা বা খবরের কাগজ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে মূত্রনালির সংক্রমণ ও প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণসহ নানা রোগ বাড়ছে। দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে, ফলে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। থিনজার শুনলেই ই জানান, ইউটিআই সংক্রমণের কারণে অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য নিয়মিত অনুরোধ আসছে। শারীরিক সমস্যার কারণে অনেক নারী ঘরে অবস্থান করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এ নিষেধাজ্ঞার পেছনে রয়েছে জান্তার ‘ফোর কাটস’ কৌশল, যার লক্ষ্য বিদ্রোহীদের খাদ্য, অর্থ, তথ্য ও নতুন সদস্য সংগ্রহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। গত আগস্ট থেকে বিরোধী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এই কৌশল কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, মান্দালয় ও সাগাইংয়ের সংযোগকারী সেতু দিয়ে স্যানিটারি প্যাড পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের সংস্কৃতিতে মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা ট্যাম্পুনের মতো আধুনিক বিকল্পের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। এ ধরনের পণ্য সম্পর্কে তথ্য জানাকেও সামাজিকভাবে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়। সমাজ নারীদের শিখিয়েছে ঋতুস্রাবের বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে, আর এই সামাজিক দুর্বলতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে সামরিক জান্তা।

Advertisements