বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

বিয়ের আগে স্বামী-স্ত্রীর যে ৬ পরীক্ষা করা জরুরি, জানালেন তাসনিম জারা

tasnim-jara-2512271411

যারা বিয়ের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি। কিছু রোগ আছে যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু বিয়ের পরে খুব সহজে স্বামী থেকে স্ত্রী, স্ত্রী থেকে স্বামী বা তারা যখন সন্তান নেন, তাদের মধ্যে ছড়াতে পারে। একটু সচেতন হয়ে আগেই কিছু টেস্ট করালে, রোগগুলো ধরা সম্ভব, চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলা বা পরিবারের মধ্যে বিস্তার রোধ করা সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের চিকিৎসক ও সহায় হেলথের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডা. তাসনিম জারা একটি ভিডিওতে জানান, বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে তিনি মোট ৬টি পরীক্ষার কথা বলেছেন।

১. থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা

তাসনিম জারা বলেন, প্রায় ১০ বছর আগের কথা। আমি তখন মেডিকেল কলেজে পড়ি। ফোন পেয়ে একজন রোগীর জন্য রক্তদান করতে গিয়েছি। যেয়ে দেখি যার রক্ত লাগবে সে একজন শিশু। বয়স হবে মাত্র ১০ কি ১১। প্রতি মাসেই তার রক্ত নেওয়া লাগে। সাথে ওর বাবা-মা ছিল। বলছিল প্রতি মাসে রক্ত জোগাড় করতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। তাও তারা সাধ্যমত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এই শিশুটার যে রোগ হয়েছিলো তার নাম থ্যালাসেমিয়া। থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য। সিম্পল একটা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই জেনে নেওয়া যায় সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি নেই। যেহেতু শিশুটির বাবা-মা টেস্টটি আগে থেকে করান নাই, তাই তাদের জানা ছিলো না যে তাদের সন্তানের এমন একটা জটিল রোগ হতে পারে।

শিশুর এই জটিল রোগটা এসেছিলো তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে। বাবা-মা দুজনেরই থ্যালাসেমিয়া মাইনর ছিল। কিন্তু তারা তা জানতেন না। বাবা-মা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন – কোনো অসুখ ছিল না, লক্ষণ ছিল না, এটা নিয়ে তারা কখনো চিন্তাও করেননি। বেশিরভাগ মানুষ যাদের থ্যালাসেমিয়া মাইনর থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ থাকেন, কখনো কখনো একটু রক্তশূন্যতা দেখা যায়।

যখন সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মায়, তখন তারা প্রথম জানতে পারেন যে তাদের নিজেদের থ্যালাসেমিয়া মাইনর ছিল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে – তাদের সন্তান একটা গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে, যা শিশুটাকে সারাজীবন ভোগাতে পারে। তাহলে করণীয় কি? বিয়ের আগে দুজনেই একটা রক্ত পরীক্ষা করবেন। তাহলে তখনই ধরা পড়বে আপনাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা।

পরীক্ষা করলে কেমন ফলাফল আসতে পারে? মোটা দাগে, তিন ধরনের ফলাফল আসতে পারে। ১. দুজনের একজনেরও রক্তে কোনো সমস্যা নাই। এমন ফলাফল আসলে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নাই।

২. দুজনের মধ্যে একজনের থ্যালাসেমিয়া মাইনর ধরা পড়লে- এ ক্ষেত্রেও বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নাই। তবে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মাইনর হওয়ার ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ বাচ্চা অসুস্থ হবে না, কিন্তু সে থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে। অর্থাৎ প্রথম দুই ধরনের ফলাফলে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নাই। এখন আসি তৃতীয় ধরনের ফলাফলে –

৩. দুজনের থ্যালাসেমিয়া মাইনর ধরা পড়লে- এ ক্ষেত্রে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ এই ধরনের ফলাফল আসলে চিন্তাভাবনার ব্যাপার আছে।

২. হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা

দ্বিতীয় পরীক্ষা হচ্ছে হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা। হেপাটাইটিস বি একটা ভাইরাস যা আমাদের লিভারে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু যাদের শরীরে এই ভাইরাসটা বসবাস করছে, তারা অনেকেই জানেন না যে তারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত। ফলে নিজের অজান্তেই তারা অন্য মানুষের মধ্যেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন। সুরক্ষা ছাড়া সহবাস করলে একজন থেকে আরেকজনের শরীরে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহজেই এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই বিয়ের আগেই দুজনেই এটা পরীক্ষা করে নিতে পারেন।

৩. হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা

হেপাটাইটিস বি এর মতো হেপাটাইটিস সি-ও এক ধরনের ভাইরাস যা লিভারের অনেক ক্ষতি করতে পারে। এটা ছড়ায় সাধারণত রক্তের মাধ্যমে। একই সুই বা ইনজেকশন ব্যবহার করলে যাতে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত লেগে থাকতে পারে, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ঠিকমত জীবাণুমুক্ত না করলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। লিভার অনেকটুকু নষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। অর্থাৎ অজান্তেই অনেকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে এবং অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে। সুরক্ষা ছাড়া সহবাসের মাধ্যমে এবং মা থেকে সন্তানের শরীরে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে, যদিও এভাবে ছড়ানোর সম্ভাবনা খুব কম। তবে কম হলেও যেহেতু একটা সম্ভাবনা আছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছড়ানোর এবং মা থেকে সন্তানে ছড়ানোর, তাই পরীক্ষা করিয়ে নেয়াই শ্রেয়। এই পরীক্ষাটা করে নিতে পারেন। পজিটিভ আসলে আপনার চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষা করাতে বলবেন কনফার্ম হবার জন্য এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদানের জন্য। হেপাটাইটিস সি চিকিৎসা করলে সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়ে যেতে পারে। আর আপনার কাছ থেকে আপনার পার্টনারের শরীরে এই ভাইরাস যাতে না ছড়ায় সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

৪. এইচআইভি (HIV) পরীক্ষা

এইচআইভি সম্বন্ধে আপনারা অনেকেই জানেন। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সহবাসের মাধ্যমে সাধারণত এটা ছড়ায়। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই সুই বা ইনজেকশন ব্যবহার করলে, জন্মের সময়ে মায়ের কাছ থেকে বা মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে এই এইচআইভি ভাইরাসের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। আর সেই সময়ে অজান্তে একজন থেকে আরেকজনে ছড়াতে পারে। স্ত্রী থেকে স্বামীতে, স্বামী থেকে স্ত্রীতে, স্ত্রী থেকে সন্তানে ইত্যাদি। তাই পরীক্ষা করে নেওয়া শ্রেয়।

পজিটিভ আসলে চিকিৎসার জন্য ওষুধ শুরু করতে পারবেন, যা আপনার রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ কমিয়ে আনবে। কয়েক মাসের মধ্যে ভাইরাসের পরিমাণ এতটাও কমে যেতে পারে যে আপনি এটা আর কাউকে ছড়াতে পারবেন না।

৫. যৌনবাহিত রোগ পরীক্ষা

অনেকেই যৌনবাহিত রোগে বা sexually transmitted infections এ ভোগেন কিন্তু জানেন না। শুধুমাত্র টেস্ট করার পরে ধরা পড়ে। কিন্তু অনেকেরই যেহেতু কোনো লক্ষণ থাকে না, ফলে টেস্ট করা হয় না, চিকিৎসাও হয় না। পরে নানান ধরনের শারীরিক সমস্যা, যেমন- সন্তানধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অথচ সময়মত অল্প কয়েকদিনের অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স নিলেই রোগটা সেরে যেত।

এ ৪টা কমন যৌনবাহিত রোগ পরীক্ষা করতে পারেন: – সিফিলিস (Syphilis) – গনোরিয়া (Gonorrhoea) – ক্লামিডিয়া (Chlamydia) – ট্রিকোমনায়াসিস (Trichomoniasis) রোগ ধরা পরলে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারবেন এবং একজন থেকে আরেকজনে ছড়ানোও ঠেকাতে পারবেন।

৬. রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা

বিয়ের আগে রক্তের গ্রুপ জানতেই হবে, এমন না। অনেকের একটা ধারণা আছে যে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ একই হলে সমস্যা হতে পারে, এই কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হলে এবং গর্ভের সন্তানের রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হলে প্রেগ্নেন্সিতে বা বাচ্চা জন্মের পরপর একটা ইনজেকশন দিতে হয়, যেটা আপনার চিকিৎসকই তখন বলে দিবেন। তাও একজন আরেকজনের রক্তের গ্রুপ জানা থাকা ভালো। হঠাৎ কোন বিপদে পড়লে কাজে লাগতে পারে। তাই রক্তের গ্রুপ জানা না থাকলে বিয়ের আগে এই পরীক্ষাটা করিয়ে নিতে পারেন।

আরেকটা বিশেষ কথা, যেই টেস্টগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনটাতে রোগ ধরা পড়লেই যে বিয়ে করা যাবে না, তা না। অনেকগুলো রোগের চিকিৎসা আছে, একজন থেকে আরেকজনে যাতে না ছড়ায় তেমন অনেক ব্যবস্থা আছে।

তাসনিম জারাপরিকল্পনাবিয়ে